আত্মার অস্তিত্বের সপক্ষে নৈয়ায়িকদের প্রমাণগুলি কী?

আত্মার অস্তিত্বের সপক্ষে নৈয়ায়িকদের প্রমাণ

আত্মা সম্পর্কিত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দাবি করা হয় যে, আত্মা বলে অবশ্যই কিছু আছে। ন্যায় মতে, আত্মা হল দেহ থেকে স্বতন্ত্র কোনো কিছু। কিন্তু প্রশ্ন হল, দেহ থেকে স্বতন্ত্র আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করা কীভাবে সম্ভব? এ সম্পর্কে অবশ্য নৈয়ায়িকদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়।

প্রাচীন মতে আত্মার অস্তিত্ব অনুমানসিদ্ধ: 

প্রাচীন নৈয়ায়িকদের মতে, আত্মার অস্তিত্ব কখনোই সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষের মাধ্যমে জানা যায় না। আত্মাকে তাই কেবল অনুমান প্রমাণের মাধ্যমেই জানা সম্ভব। প্রাচীন মতে, আবার আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় শাস্ত্র প্রমাণ থেকে। বেদ, উপনিষদ এবং শ্রুতি প্রভৃতিতে আত্মার অস্তিত্বের উল্লেখ আছে। বেদ, উপনিষদ এবং শ্রুতি প্রভৃতিকে আত্মার প্রামাণ্যরূপে স্বীকার করে নিলে, তাদের মধ্যে উল্লিখিত আত্মার অস্তিত্বও স্বীকার করে নিতে হয়। এ ছাড়াও বলা যায় যে, রাগ, দ্বেষ এবং সুখ-দুঃখের অনুভূতি থেকেও তাদের ধারক হিসেবে আত্মার অস্তিত্ব অনুমান করা যায়।


স্মৃতির আশ্রয়রূপে আত্মার অস্তিত্ব অনুমানসিদ্ধ: 

মহর্ষি গৌতম এবং মহর্ষি বাৎস্যায়ন দাবি করেন যে, স্থায়ী আত্মার অস্তিত্বকে স্বীকার করে না নিলে, রাগ, দ্বেষ, সুখ-দুঃখ এবং ইচ্ছা প্রভৃতির কোনো ব্যাখ্যা করাই সম্ভব নয়। কারণ, কোনো বস্তুকে সুখদায়ক জেনেই আমরা তার কামনা করে থাকি। আবার কোনো বস্তু দুঃখদায়ক জেনেই আমরা তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। এই সমস্ত বিষয় স্মৃতির মাধ্যমেই আমাদের মধ্যে জাগরিত হয়। স্মৃতিকে যদি স্বীকার করে নেওয়া হয়, তাহলে তার আশ্রয়রূপে আত্মার অস্তিত্বও অনুমানের সাহায্যে স্বীকার্য।

নব্য মতে আত্মার অস্তিত্ব মানস প্রত্যক্ষে সাক্ষাত্তাবে প্রমাণিত: 

নব্য নৈয়ায়িকদের মতে, আত্মার অস্তিত্ব মানস প্রত্যক্ষের সাহায্যে সরাসরিভাবে জানা সম্ভব। অর্থাৎ, আত্মার অস্তিত্ব সরাসরিভাবে মানস প্রত্যক্ষসিদ্ধ। তাঁদের মতে, মনের সঙ্গে যখন শুদ্ধ আত্মার (pure self) সংযোগ ঘটে, তখন শুদ্ধ আত্মচেতনার মাধ্যমেই আত্মার সাক্ষাৎ জ্ঞান লাভ হয়। অবশ্য কোনো কোনো নব্য নৈয়ায়িক বলেন যে, শুদ্ধ আত্মা প্রত্যক্ষের বিষয়রূপে গণ্য নয়। অনুভূতি বুদ্ধি এবং প্রযত্ন প্রভৃতির মাধ্যমেই আত্মার অস্তিত্ব সাক্ষাৎভাবে প্রমাণিত।

চৈতন্যের সমবায়ী কারণরূপে আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণিত: 

বলা যায় যে, চৈতন্যের অস্তিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণিত। কারণ, চৈতন্য শরীরের, ইন্দ্রিয়ের বা মনের কোনো ধর্ম নয়। চৈতন্য আত্মারূপ দ্রব্যকেই আশ্রয় করে বিরাজমান। আত্মার সঙ্গে চৈতন্যের সম্বন্ধকে সমবায় সম্বন্ধরূপে উল্লেখ করা হয়। সুতরাং চৈতন্যকে স্বীকার করে নিলে, তার সমবায়ী আশ্রয় হিসেবে আত্মার অস্তিত্বও প্রমাণিত। এ ছাড়াও বলা যায় যে, যোগীরা নিরন্তর ধ্যানের মাধ্যমে আত্মার অস্তিত্বকে প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ। সুতরাং দেখা যায় যে, যোগীদের যোগসাধনালব্ধ অলৌকিক প্রত্যক্ষের সাহায্যেও আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ