বিবেকানন্দের মতে মানুষের দৈহিক প্রকৃতি কী?

 বিবেকানন্দের মতে মানুষের দৈহিক প্রকৃতি

বিবেকানন্দের মতে মানুষের দৈহিক প্রকৃতি প্রদত্ত আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপিত করা যায়-

দৈহিক ও আধ্যাত্মিক প্রকৃতিতে মানুষ: 

বিবেকানন্দের দর্শনে মানবপ্রকৃতি প্রতিভাত হয়েছে দৈহিক প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক প্রকৃতির এক সূক্ষ্ম সমন্বয়ে। তিনি তাই মানুষের কোনো প্রকৃতিকেই উপেক্ষা করেননি। তাঁর মতে, প্রকৃত মানুষ হল আধ্যাত্মিক শক্তির এক কেন্দ্রীভূত অবস্থা। অর্থাৎ, অধ্যাত্ম শক্তিই হল মানুষের মূল পরিচয়। এই অধ্যাত্ম শক্তিকে দু-ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে-নঞর্থকভাবে ও সদর্থকভাবে। নঞর্থকভাবে অধ্যায় শক্তি হল সেই শক্তি যা জাগতিক ও সাধারণ অবস্থারূপে গণ্য নয়। অর্থাৎ, মানুষ সাধারণভাবে যেরূপ দৃষ্ট হয়, তা ঠিক সেরূপ নয়। অন্যদিকে, সদর্থকভাবে অধ্যাত্ম শক্তি হল সেই শক্তি যা জাগতিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এক অসীম ও অনন্ত সত্তার দিকে ধাবিত হয়।

আধ্যাত্মিক প্রকৃতিকে স্বীকার করেও দৈহিক প্রকৃতিতে গুরুত্ব দান:

বিবেকানন্দ মানবপ্রকৃতির আধ্যাত্মিক দিকটির ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেও দৈহিক দিকটিকে কখনোই উপেক্ষা করেননি। তাঁর মতে, মানুষ তার সাধারণ ও জাগতিক দৈহিক অবস্থা থেকেই আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। এর ফলে মানুষের অসাধারণ ও অতিজাগতিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার বাসনা হয়। তিনি দাবি করেন যে, মানুষের প্রকৃতিতেই তার আধ্যাত্মিক চেতনা বিদ্যমান। আর এই আধ্যাত্মিক চেতনার জন্যই মানুষ তার নিজস্ব দৈহিক ও জাগতিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এক অসীম ও অনন্ত সত্তার দিকে এগিয়ে যায়। 

আধ্যাত্মিক প্রকৃতির সূচকে দৈহিক প্রকৃতি :

বিবেকানন্দ মানুষের আধ্যাত্মিক প্রকৃতির ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেও, তিনি কখনোই মানুষের দৈহিক প্রকৃতিকে উপেক্ষা করেননি। মানুষের দৈহিক প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত হল তার দেহ, মন এবং অন্যান্য জৈবিক বৃত্তিসমূহ। রক্তমাংসের জীব হিসেবে মানুষ এই বৃত্তিগুলির অধিকারী। এগুলিকে ছেড়ে মানুষের দৈহিক সত্তা কখনোই সুস্থভাবে থাকতে পারে না। আর মানুষের দৈহিক প্রকৃতি সুস্থ ও সবল না হলে, তার আধ্যাত্মিক প্রকৃতিও কখনোই সুস্থ ও সবল হতে পারে না। মানুষের দৈহিক সত্তা বা প্রকৃতি আছে বলেই মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক প্রকৃতির জাগরণ সম্ভব।

পরিপূর্ণ একত্বের প্রকাশে দৈহিক প্রকৃতি: 

এমন অনেক প্রাণী বা পশু আছে যার শারীরিক সক্ষমতা মানুষ অপেক্ষা অনেক বেশি। কিন্তু বিবেকানন্দ দাবি করেন যে, মানুষেরই শক্তি অনেক বেশি। কারণ, মানুষের দৈহিক প্রকৃতি অনেক বেশি সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ। মানুষের দৈহিক প্রকৃতিতে তাই এক ধরনের পরিপূর্ণ ঐক্য লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন ঘটনার প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া শুধু প্রবণতাজাত বা যান্ত্রিকতাসম্পন্ন নয়। মানুষের দেহ তাই কখনোই একটি নিছক প্রতিক্রিয়াশীল বস্তু নয়। এ হল এক পরিকল্পনাপ্রসূত ব্যবস্থা। সব মানুষ তাই সমস্ত ঘটনাতেই প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে না। মানুষ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য থেকে কিছু নির্দিষ্ট ঘটনাকে নির্বাচন করে নেয় এবং তার প্রতি কেমন প্রতিক্রিয়া করা উচিত, তা বিবেচনা করেই সে তার প্রতিক্রিয়া ব্যস্ত করে। মানুষের এরূপ বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই মানুষকে সমস্ত জীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসন দান করেছে। সুতরাং, মানুষের দৈহিক প্রকৃতিতেও বিশেষ এক অবস্থান লক্ষ করা যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন