বিবেকানন্দের মতে সত্য ও ঈশ্বর কী?

 বিবেকানন্দের মতে সত্য ও ঈশ্বর

দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে সত্য (reality) এবং ঈশ্বরকে (God) এক বলা হয় না। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনে এই দুটি ধারণা পৃথকরূপে গণ্য নয়। এই দুটি ধারণাকে তিনি একই অর্থে প্রয়োগ করেছেন।

সত্য ও ঈশ্বরের অযৌক্তিক পার্থক্য: 

দর্শনগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রথাসিদ্ধ ধারণায় সত্যকে ব্যাখ্যা করা হয় এক প্রকার পরাবিদ্যাগত ধারণা হিসেবে। অপরদিকে, ঈশ্বরকে উল্লেখ করা হয় এক সর্বোচ্চ ধর্মীয় ধারণা হিসেবে। কিন্তু, স্বামী বিবেকানন্দ এরূপ প্রথাসিদ্ধ বিভাজনকে অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিকরূপে উল্লেখ করেছেন।

অদ্বিতীয় রূপে ঈশ্বর: 

বিবেকানন্দের দার্শনিক চিন্তাধারা অদ্বৈত বেদান্তের চিন্তাধারায় স্নাত। এরূপ চিন্তাধারায় স্নাত হয়ে তিনি বলেন যে, সত্য হল চরমব্রহ্ম। তিনি বলেন যে, সত্য হল এক, কিন্তু কখনোই সমগ্র নয়। কারণ, সমগ্রের ধারণাটি নির্দেশ করে যে, সমগ্রের কয়েকটি অংশ থাকে। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ যাকে পরমব্রহ্ম (absolute) বা অসীম (infinite)- রূপে উল্লেখ করেছেন তা হল এক পরিপূর্ণ একত্বস্বরূপ। এখানে তাই অংশ ও সমগ্রের বিভাজন রেখা লুপ্ত হয়েছে এবং এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর সূচিত হয়েছে। এরূপ এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরকে আমরা পাই বিমূর্ত্তায়নের চরমতম পর্যায়ে। 

পরব্রহ্ম রূপে ঈশ্বর: 

প্রকৃতপক্ষে স্বামীজি বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ তার মনের পরিতৃপ্তির জন্যই বিভিন্নরকম ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। আর মানুষের এরূপ সন্তুষ্টি প্রদান করতে পারে শুধুমাত্র ব্যক্তি-ঈশ্বর (personal God)। অদ্বৈত বেদান্তে ঈশ্বরের ধারণার কথা বলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ঈশ্বরকে অজ্ঞান ও মায়াপ্রসূতরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে যে, পারমার্থিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ঈশ্বর আদৌ সত্য নয়। কিন্তু বিবেকানন্দ মনে করেন যে, অসীম পরমব্রহ্ম এবং ঈশ্বর-এই দুটি পৃথক সত্তা নয়।

ঈশ্বর মায়াসৃষ্ট নয়

বিবেকানন্দের মতে, ঈশ্বর মায়ার দ্বারা সৃষ্ট এমন নয়। ঈশ্বর ও পরমব্রত্মের পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে আমাদের অবিদ্যা তথা অজ্ঞতা থেকেই। এ হল আমাদের সীমিত উপলব্ধিগত পার্থক্য। কিন্তু যথার্থ জ্ঞান তথা আত্মজ্ঞান পরিপূর্ণ উপলব্ধিকে অনুভব করে এবং সত্য ও ঈশ্বরের পার্থক্যকে উপেক্ষা করে। সুতরাং, এই দাবি করা সংগত যে, যে সত্যকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঈশ্বররূপে উল্লেখ করা হয়, সেই একই সত্যকে অধিবিদ্যাগত দিক থেকে অসীমরূপে স্বীকার করা হয়।

সর্বব্যাপক সত্তারূপে ঈশ্বর: 

সিদ্ধান্তগতভাবে উল্লেখ করা যায় যে. স্বামী বিবেকানন্দ ঈশ্বরের সর্বব্যাপক সত্তার ওপরই সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর মতে, ঈশ্বর আমাদের জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। তিনি সর্বস্থানে সর্বক্ষেত্রেই বিরাজমান। ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণেই সূর্য প্রভা দান করে, আকাশ-বাতাস বিস্তার লাভ করে, জীবকুল নিশ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। অর্থাৎ, তাঁর নিয়ন্ত্রণেই আমাদের জীবন ও জগৎ নিয়ন্ত্রিত হয়। ঈশ্বর হলেন সমুদ্রস্বরূপ, আর জাগতিক সমস্ত বিষয়ই হল তার ঢেউয়ের মতো, তাই এগুলিকে পরস্পরের থেকে আদৌ বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ