বিবেকানন্দের মতে কর্মের রহস্য কী?

বিবেকানন্দের মতে কর্মের রহস্য

মানুষকে জীবনধারণ করতে হলে অবশ্যই কর্ম সম্পাদন করতে হয়। কর্মকে এড়িয়ে থাকার উপায় কারও নেই। কিন্তু এই কর্মসম্পাদনের রহস্য কী? উপনিষদ আমাদের কাছে কর্মরহস্যের দ্বারটি উদ্‌ঘাটিত করে। বৈদিক যুগে, বিশেষ করে ঋগ্বেদে কর্ম শব্দটি ক্রিয়া অর্থেই প্রযুক্ত হয়েছে। কিন্তু বৈদিক যুগের শেষভাগে কর্ম শব্দটির ধারণায় পরিবর্তন আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কর্ম শব্দটি মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে—ক্রিয়া এবং অক্রিয়া। ক্রিয়া শব্দটি ব্যবহৃত হত মূলত পার্থিব জগতের কার্যকারণ তত্ত্ব হিসেবে আর অক্রিয়া শব্দটি প্রচলিত ছিল অপার্থিব পরলোকের ভিত্তি হিসেবে। কিন্তু দেখা যায় যে, ক্রমে ক্রমে শেষোক্ত অর্থটিই প্রাধান্য লাভ করে।

কর্মের গতি প্রক্রিয়া: 

উপনিষদের চিন্তানায়কগণ ক্রমে ক্রমে কর্ম শব্দটির সঙ্গে জন্মান্তরবাদের ধারণাটিকে সংযুক্ত করেন। সেই যুগের সমাজ ও মানুষের চিন্তাচেতনা সম্পর্কে উপনিষদীয় চিন্তানায়কগণ অবশ্যই পরিচিত | ছিলেন। তাঁরা তাঁদের এরূপ অবহিতির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের কর্মের গতিপ্রক্রিয়াকে তিনটি স্তরে উল্লেখ করেছেন। এই তিনটি স্তর হল যথাক্রমে- পিতৃলোক, দেবলোক এবং ব্রহ্মলোক। এক্ষেত্রে লোক বলতে যান বা পথকেই নির্দেশ করা হয়। পিতৃযান পিতৃলোকে সীমাবদ্ধ থাকে। দেবযান দেবলোকের চূড়ান্ত স্তরে ব্রহ্মলোক প্রাপ্তিতে সাহায্য করে। আর ব্রহ্মলোক হল উত্তরণের চরম স্তরে আরোহণ। পিতৃযান এই লোকের অবস্থানকে নির্দেশ করে, আর দেবযান হল ব্রহ্মলোকের বৈতরণিস্বরূপ।

আধ্যাত্মিকভাবে প্রণোদিত কর্মই শ্রেষ্ঠ কর্ম: 

স্বামী বিবেকানন্দের মতে, অপরকে সাহায্য করা একটি মহৎ কর্ম। কিন্তু এরূপ কর্মের দ্বারা কোনো চিরকালীন অভাবকে দূর করা যায় না। কারণ, একমাত্র অধ্যাত্মজ্ঞান তথা আত্মজ্ঞানই মানুষের চিরকালীন অভাবকে দূর করতে পারে। সুতরাং আধ্যাত্মিকভাবে সাহায্য করার কর্মই হল মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্য কর্ম। কারণ, জ্ঞানই মানুষের প্রকৃত জীবন, আর অজ্ঞান হল মানুষের মৃত্যুতুল্য।

আসক্তিহীন কর্মই মোক্ষাভিমুখী
গীতার মূলভাবটি হল নিরন্তর কর্ম করো কিন্তু তাতে আসত্তি যেন না আসে। এরূপ আসত্তিহীন কর্মই হল যথার্থ কর্ম। এরূপ কর্মে মানুষের ইন্দ্রিয় বৃত্তিগুলি সংযত হয় এবং কর্মফলে অনাসক্তি আসে। মানুষের ইন্দ্রিয়বৃত্তিগুলি নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে সংযত হয়ে দৃঢ় চরিত্র গঠন করে। শত চেষ্টাতেও সেগুলি কখনোই বহির্মুখী হয় না। কচ্ছপের সংযত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির মতো ইন্দ্রিয়গুলি অন্তরে আবদ্ধ থাকে। এভাবেই অর্জিত হয় আত্মার মুমুক্ষুত্ব, আর এই মুমুক্ষুত্বই মানুষকে ঊর্ধ্বগামী করে মোক্ষাভিমুখী করে তোলে।

নিঃস্বার্থভাবে কর্মসম্পাদন: 
বিবেকানন্দের মতে, স্বার্থের জন্য কৃতকর্ম হল ক্রীতদাসসুলভ কর্ম। কিন্তু নিঃস্বার্থভাবে কৃতকর্মই হল যথার্থ প্রভুসুলভ কর্ম। আর এরূপ কর্মের মাধ্যমেই মানুষ আধ্যাত্মিক উন্নতির চরমতম সোপানে উন্নীত হতে পারে। সুতরাং স্বার্থ ত্যাগ করে কর্ম করে, জীবনের চরম আদর্শের পথে এগিয়ে যাওয়াই হল মানুষের প্রকৃত কর্ম-আর এখানেই নিহিত মানুষের কর্মের রহস্যটি। অর্থাৎ, বলা যায় যে, আধ্যাত্মিকভাবে আসক্তিশূন্য নিঃস্বার্থ কর্মসম্পাদনের মধ্যেই কর্মের রহস্যটি লুকিয়ে আছে বলে কর্মবীর বিবেকানন্দ মনে করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ