ন্যায় মতে কীভাবে আত্মার মুক্তি ঘটে তা আলোচনা করো।

 ন্যায় মতে আত্মার মুক্তি বা নিঃশ্রেয়স

অপরাপর আস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায়গুলির ন্যায় নৈয়ায়িকগণ আত্মার মুক্তি বা নিঃশ্রেয়সকেই চরম ও পরম পুরুষার্থরূপে উল্লেখ করেছেন। আত্যন্তিক দুঃখ থেকে নিবৃত্তিকেই ন্যায় বৈশেষিক দর্শনে মোক্ষ বা মুক্তিরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। বাৎস্যায়নভাষ্যে 'নিঃশ্রেয়স' শব্দের অর্থ করা হয়েছে- 

নিশ্চিতং শ্রেয়ঃ নিঃশ্রেয়সম। অর্থাৎ, যা নিশ্চিত শ্রেয়রূপে গণ্য, তাকেই বলা হয় নিঃশ্রেয়স বা মুক্তি। ন্যায় মতে, মুক্তিই হল নিশ্চিত শ্রেয়। এই কারণে মুক্তি অর্থেই নিঃশ্রেয়স শব্দটির বহুল প্রয়োগ লক্ষ করা যায়।


দেহবন্ধন থেকে যুক্তরূপে নিঃশ্রেয়স বা মুক্তি: 

নৈয়ায়িকদের মতে,আত্মা হল স্বরূপত নির্গুণ, নিষ্ক্রিয় এবং চৈতন্যহীন দ্রব্যস্বরূপ। আত্মা দেহের সঙ্গে যুক্ত হলে, দেহ মনের সঙ্গে যুক্ত হলে, মন ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে, এবং ইন্দ্রিয় বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে তবেই আত্মার বুদ্ধি, দ্বেষ, ইচ্ছা, সুখ, দুঃখ এবং প্রযত্ন প্রভৃতি গুণ আবির্ভূত হয়। মন ও দেহের সঙ্গে আত্মার সংযোগই আত্মার বন্ধাবস্থা। আত্মা যতক্ষণ দেহের সঙ্গে যুক্ত থাকে, ততক্ষণই তার বন্ধনদশা সূচিত হয়। সেক্ষেত্রে তার আত্যন্তিক দুঃখনিবৃত্তির কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। ফলত শরীর ধারণ করার জন্যই আত্মাকে বিভিন্নপ্রকার দুঃখ ভোগ করতে হয়। সুতরাং, দেহবন্ধন থেকে মুক্ত হলে তবেই আত্মার আত্যন্তিক দুঃখ মুক্তি সম্ভব।


মিথ্যাজ্ঞানের অবসানরূপে নিঃশ্রেয়স বা মুক্তি: প্রশ্ন হল জীবের


দেহ ধারণের কারণ কী? ন্যায়দর্শনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধর্মাচরণের ফলস্বরূপ সুখভোগের নিমিত্ত এবং অধর্মাচরণের ফলস্বরূপ দুঃখ ভোগ করার নিমিত্তই জীবকে জন্মগ্রহণ করতে হয় এবং দেহধারণ করতে হয়। ন্যায় মতে, জীবের শুভপ্রবৃত্তি এবং অশুভপ্রবৃত্তি থেকেই ধর্ম এবং অধর্মের উৎপত্তি হয়। কাম্যবস্তুর প্রতি আসক্তির প্রভাবে এবং অপ্রিয় বস্তুর প্রতি দ্বেষভাবাপন্নের পরিপ্রেক্ষিতেই জীবের প্রবৃত্তির উৎপত্তি ঘটে। এরূপ আসক্তি এবং দ্বেষের মূলে হল মিথ্যাজ্ঞান। সুতরাং, মিথ্যাজ্ঞানই হল আমাদের সমস্তপ্রকার দুঃখের মূল কারণ। সুতরাং বলা যায় যে, মিথ্যাজ্ঞানের অবসানেই লাভ করা যায়


মোক্ষ বা নিঃশ্রেয়স।

তত্ত্বজ্ঞানে নিঃশ্রেয়স বা মুক্তি: ন্যায় মতে, মিথ্যাজ্ঞান থেকেই উৎপন্ন হয় তিনপ্রকার দোষ-রাগ, দ্বেষ এবং মোহ। মিথ্যাজ্ঞান থেকেই উৎপন্ন হয় রাগ ও দ্বেষ। রাগ ও দ্বেষ থেকে উৎপন্ন হয় প্রবৃত্তি বা মোহ। প্রবৃত্তি বা মোহ থেকে নিঃসৃত হয় জন্ম এবং জন্ম থেকে উৎপত্তি হয় যাবতীয় দুঃখের। সে- কারণেই নৈয়ায়িকগণ দাবি করেন যে, দুঃখের মূল কারণ যে মিথ্যাজ্ঞান, সেই মিথ্যা- জ্ঞানকে দূর করতে পারলে তবেই দুঃখ মুক্তি তথা নিঃশ্রেয়স লাভ সম্ভব। যথার্থ বা তত্ত্বজ্ঞানের সাহায্যেই মিথ্যাজ্ঞানের অপসারণ সম্ভব। তত্ত্বজ্ঞানেই তাই মোক্ষ বা মুক্তি লাভ হতে পারে। সেকারণেই ন্যায় সূত্রে বলা হয়েছে- তত্ত্বজ্ঞানাৎ নিঃশ্রেয়সাধিগমঃ, অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞান থেকেই নিঃশ্রেয়স লাভ সম্ভব।


আত্মার নিজস্বরূপে নিঃশ্রেয়স বা মুক্তি: 

ন্যায় মতে, যে বারোটি প্রমেয় পদার্থ স্বীকৃত হয়েছে তাদের যথাযথ জ্ঞানই হল তত্ত্বজ্ঞান। এই তত্ত্বজ্ঞান তাই মিথ্যাজ্ঞানকে বিনষ্ট করে। অর্থাৎ, আত্মার যথার্থ স্বরূপজ্ঞানই মিথ্যাজ্ঞানকে বিনষ্ট করতে সক্ষম। মিথ্যাজ্ঞান বিনষ্ট হলেই জীবাত্মাকে আর পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হয় না। এর ফলে দুঃখের চির অবসান ঘটে। মোক্ষ বা মুক্তি অবস্থায় আত্মা নিজ স্বরূপে অবস্থান করে। নিঃশ্রেয়স তাই দুঃখের সাময়িক নিবৃত্তি নয়, তা হল দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তি। শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনে নিঃশ্রেয়স বা মুক্তি: ন্যায় মতে, তত্ত্বজ্ঞানের জন্য প্রয়োজন হল-শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসন। শ্রবণের অর্থ হল, আত্মার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে শাস্ত্রবাক্যের উপদেশ শ্রবণ করা বা শোনা। মননের অর্থ হল, শাস্ত্র নির্দেশিত উপদেশ মনে মনে চিন্তা করা এবং তাকে মনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ, শাস্ত্রবাক্যের বিচারপূর্বক গ্রহণকেই বলা হয় মনন। নিদিধ্যাসনের অর্থ হল, নিরন্তর যোগাভ্যাসের দ্বারা আত্মার স্বরূপ

প্রত্যক্ষ করা। নিরন্তর ধ্যান বা যোগাভ্যাসের দ্বারাই সত্যের সাক্ষাৎ উপলব্ধি ঘটে এবং অজ্ঞান বা মিথ্যাজ্ঞান দূরীভূত হয়। এভাবেই তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় এবং আত্মা বা জীবের মোক্ষলাভ ঘটে।


বিদেহী মুক্তিতে চরম মুক্তি: 

তত্ত্বজ্ঞান লাভ হলে সমস্তপ্রকার সন্বিত ও সঞ্চয়মান কর্মফল বিনষ্ট হয়। অবশ্য আবদ্ধ কর্মের ফল জীবকে তখনও ভোগ করতে হয়। তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেও আবদ্ধ কর্মফল ভোগের নিমিত্ত জীবকে বেঁচে থাকতে হয়। মোক্ষের এরূপ অবস্থাকে বলা হয় জীবনমুক্তি। জীবনমুক্ত পুরুষ দেহের অবসানের পর বিদেহীমুক্তি লাভ করেন। এক্ষেত্রে আত্মার পুনর্জন্মের আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এই বিদেহী মুক্তিকেই ন্যায়দর্শনে চরম মুক্তি বা পরম মুক্তিরূপে উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ