অনাসক্তিকে কেন পূর্ণ আত্মত্যাগ বলা হয়?

অনাসক্তিকে পূর্ণ আত্মত্যাগ বলার কারণ

বিবেকানন্দের কর্মযোগ অনুসারে অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ রূপে গণ্য হয় এর কারণগুলি হল-

কৃতকর্মের ফল অবশ্যম্ভাবী: 

কর্মযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে আমাদের কৃতকর্ম কোনো ফল প্রসব না করে, কখনোই নষ্ট হতে পারে না পৃথিবীর কোনো শক্তিই কৃতকর্মের ফল রোধ করতে পারে না। সেকারণে কোনো অসৎ কর্ম করলে কর্মসম্পাদনকারী ব্যক্তিকে তার ফলভোগ করতেই হয়। কোনো শক্তিই তাতে বাধা দিতে পারে না। আবার শুভকর্মের ফলও যে মানুষকে ভোগ করতেই হয়, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রেও কোনো শক্তিই বাধা হতে পারে না।

অনাসক্তিকে কেন পূর্ণ আত্মত্যাগ বলা হয়?
অনাসক্তিকে কেন পূর্ণ আত্মত্যাগ বলা হয়?


প্রত্যেকটি কর্মেরই শুভ-অশুভ ফল বিদ্যমান: 

কর্মযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমাদের সমস্ত প্রকার সৎ-অসৎ কর্ম পরস্পরের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আমরা এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা টানতে পারি না। আবার কোনো কাজ সম্পূর্ণভাবে ভালো বা সৎ, আর কোনো কাজ সম্পূর্ণভাবে মন্দ বা অসৎ এ কথা আমরা বলতে পারি না। এমন কোনো কর্ম নেই, যা একই সঙ্গে শুভ-অশুভ, এই দু-প্রকার ফলই প্রসব করে না। আমরা যদি সৎকর্মগুলিকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যায় যে, সেখানেও কোথাও-না- কোথাও কিছু অসৎ বা কিছু অশুভ ফল বিদ্যমান। যেমন আমরা যখন উচ্চৈঃস্বরে শুভ কিছু বলি, তখন বায়ুমণ্ডলের মধ্যে সহস্র সহস্র কীটাণু ধ্বংস করি। আবার অশুভ কর্মকে বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাবে যে, সেখানে কিছু-না- কিছু শুভ ফল আছে। যিনি শুভ কর্মের মধ্যে কিছু অশুভ, আর অশুভ কর্মের মধ্যে কিছু শুভ দেখেন-তিনিই প্রকৃতপক্ষে কর্মরহস্য বুঝতে সমর্থ হন।

মানুষের কর্মও ভিন্ন ভিন্ন:

বিবেকানন্দ উল্লেখ করেন যে, এই জগতে বিভিন্নরকম মানুষ দেখা যায়। সেইসব মানুষের বিভিন্নরকম কর্মও লক্ষ করা যায়। কোনো কোনো মানুষ দেবপ্রকৃতির-যাঁরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েও পরের উপকার করেন। এঁরাই হলেন পূর্ণ আত্মত্যাগী। আবার কোনো কোনো লোক হলেন সৎ বা সাধু প্রকৃতির। এঁরা ততক্ষণ পর্যন্তই পরের উপকার করেন, যতক্ষণ না তাঁদের নিজেদের কোনো ক্ষতি হয়। তৃতীয় এক শ্রেণির লোক দেখা যায়—যাঁরা নিজেদের হিতের জন্য অপরের অনিষ্ট করেন। চতুর্থ আরও এক শ্রেণির লোক আছেন যাঁরা অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যেই জন্যই পরের অনিষ্ট করেন। 

নিবৃত্তিমূলক কর্মই অনাসক্তির সূচক

বিবেকানন্দ বলেন যে, মানুষের মধ্যে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি-দুটি দিকই আছে। প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি দুটিই হল কর্ম। এদের মধ্যে প্রবৃত্তিকে তথা আসক্তিকে বলা হয় অসৎ কর্ম, আর নিবৃত্তিকে তথা অনাসক্তিকে বলা হয় সৎকর্ম। এই নিবৃত্তিই হল সকলপ্রকার নীতি ও ধর্মের মূলভিত্তি। এর পূর্ণতাই হল পরিপূর্ণ আত্মত্যাগ। এরূপ অবস্থায় মানুষ পরের জন্য মন, শরীর, এমনকি সর্বস্ব ত্যাগ করতেও রাজি থাকে। যখন এরূপ অবস্থা লাভ হয়, তখনই মানুষ কর্মযোগে সিদ্ধিলাভ করে। এটিই হল সৎকর্মের শ্রেষ্ঠ ফল। এরূপ নিঃস্বার্থতাই চরম অনাসক্তিকে সূচিত করে, আর এটিই হল পূর্ণ আত্মত্যাগ। সমস্ত কিছুর মধ্যে থেকেও যে সমস্ত কিছুতে অনাসক্তি পোষণ করে- তার কর্মের ইচ্ছাশক্তি জাগ্রত হয়। এই ইচ্ছাশক্তিই নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে কর্মে প্রণোদিত করে। মানুষ তখন নিষ্কাম কর্মযোগের একটি যন্ত্রে পরিণত হয় আর এর ফল হল সম্পূর্ণ আত্মত্যাগের অবস্থায় পৌঁছোনো। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ