বার্কলের ভাববাদে ঈশ্বরের ভূমিকা কী?

বার্কলের ডাববাদে ঈশ্বরের ভূমিকা


বার্কলে একজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক হলেও তিনি ছিলেন মূলত ধর্মযাজক বা বিশপ। সুতরাং, তাঁর দর্শনে ঈশ্বরের বিষয়টির উত্থাপন এক অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। অর্থাৎ, অভিজ্ঞতাবাদী হলেও ঈশ্বরবাদের সপক্ষে মতপ্রকাশ করা তাঁর পক্ষে আদৌ অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু তিনি তাঁর দর্শনের শুরুতেই ঈশ্বরের প্রসঙ্গকে উপস্থাপিত করেননি। তাঁর দর্শন আলোচনার শেষের দিকেই তিনি ঈশ্বরের প্রসঙ্গটি টেনে এনেছেন বা টেনে আনতে বাধ্য হয়েছেন। এর কারণ হল- 

প্রত্যক্ষকর্তা হিসেবে ঈশ্বর: বার্কলের ভাববাদের মূলভিত্তি হল তাঁর অস্তিত্ব প্রত্যক্ষনির্ভর তত্ত্ব। অর্থাৎ, কোনো কিছুর অস্তিত্ব নির্ভর করে জ্ঞাতার মনের প্রত্যক্ষের ওপর। ব্যক্তিমন যাকে জানে শুধু তারই অস্তিত্ব আছে কিন্তু যেগুলিকে ব্যক্তিমন জানতে পারে না বা প্রত্যক্ষ করতে পারে না, তাদের কি কোনো অস্তিত্বই নেই?-এরূপ প্রশ্নের উত্তরেই বার্কলে ঈশ্বরের প্রসঙ্গটি টেনে এনেছেন। তাঁর মতে, বস্তুর অস্তিত্ব হয় আমাদের অথবা ঈশ্বরের প্রত্যক্ষের ওপর নির্ভরশীল। কারণ প্রত্যেকটি ব্যক্তিমানুষই বিশেষ বিশেষ প্রত্যক্ষকর্তা হলেও, ঈশ্বর হলেন এক সার্বিক প্রত্যক্ষকর্তা।

অহংসর্বস্ববাদের পরিত্রাতারূপে ঈশ্বর স্বীকার: জ্ঞাতা এবং জ্ঞাতার মনের ধারণা ছাড়া আর কিছুই অস্তিত্বশীল নয়-বার্কলের এরূপ দাবিকে মেনে নিলে, তাঁর ভাববাদের অনিবার্য পরিণতি হয় অহংসর্বস্ববাদ (solipcism)। এই অহংসর্বস্ববাদ জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত নিন্দনীয় মতবাদ। এর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বার্কলে তাঁর দর্শনে ঈশ্বরের ভূমিকাকে স্বীকার করেছেন।

সর্বজ্ঞ ও সার্বিক প্রত্যক্ষকর্তারূপে ঈশ্বর: বার্কলে উল্লেখ করেছেন যে, আমরা যা কিছুই প্রত্যক্ষ করি না কেন, সেগুলিকে আমরা আমাদের নিজেদের ইচ্ছামতো ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে উপস্থাপিত করতে পারি না। ঈশ্বরই আমাদের মনে সেগুলির ধারণা সৃষ্টি করেন এবং আমাদের প্রভাবিত করেন। তাই ঈশ্বরই সর্বজ্ঞ ও সার্বিক প্রত্যক্ষকর্তারূপে গণ্য। তিনিই আমাদের সমস্ত প্রকার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ করেন।

ধারণাপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণকারীরূপে ঈশ্বর: বার্কলে এই জগতের সমস্ত কিছুকেই ধারণাপুঞ্জরূপে উল্লেখ করেছেন। এই ধারণাপুঞ্জ আমাদের মনে অবস্থান করলেও, এগুলির সংবেদনের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বার্কলে দাবি করেন যে, বস্তুজগৎ ঈশ্বরের ধারণাসৃষ্ট বলেই আমাদের বস্তুপ্রত্যক্ষ একপ্রকার বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করে চলে। এর ফলে বৃক্ষের প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে বৃক্ষেরই সংবেদন হয়, পর্বতের সংবেদন হয় না। সুতরাং, বস্তুজগতের অসীম নিয়ন্ত্রকরূপে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকৃত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন