ফরাসি সংবিধান সভার কার্যাবলির মূল্যায়ন করো।

ফরাসি জাতীয় সভা ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই 'সংবিধান সভা'-য় রূপান্তরিত হয়। এই সভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ছিলেন বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি।

সংবিধান সভার (১৭৮১ খ্রি.) কার্যাবলি


নতুন সংবিধান রচনা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে ফরাসি সংবিধান সভা দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে-

[1] সামন্ততন্ত্রের বিলোপ: ফরাসি জাতীয় সভা ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৪

আগস্ট থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে ফ্রান্সে সামন্ততন্ত্রের বিলোপ ঘোষণা করে। এই ঘোষণার দ্বারা- [i] সামন্তপ্রথা, [ii] ভূমিদাস প্রথা,

[iii] বিভিন্ন সামন্তকর, করভি বা বেগার খাটা, টাইদ বা ধর্মকর আদায়,

[iv] সামন্তশ্রেণির বিশেষ অধিকার প্রভৃতি বিলুপ্ত হয়।

[2] 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারপত্র': সংবিধান সভার অপর উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হল ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারপত্র' ঘোষণা। এই ঘোষণায় বলা হয়- [i] স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। [ii] আইনের চোখে প্রতিটি মানুষ সমান। [iii] জনগণ হল প্রকৃত সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। [iv] বিনা বিচারে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না। [v] ব্যক্তিস্বাধীনতা, সম্পত্তি ক্রয়বিক্রয় ও ভোগের অধিকার, বাস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রভৃতি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। [vi] সকলের ওপর ন্যায্যভাবে করারোপ করা উচিত।

সংবিধান দ্বারা বিভিন্ন কাজ


সংবিধান সভা ১৭৮৯ থেকে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দু-বছর পরিশ্রম করে ফ্রান্সের প্রথম লিখিত সংবিধান রচনা করে। সংবিধানের দ্বারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যেমন-

[1] শাসনতান্ত্রিক সংস্কার: সংবিধানের মাধ্যমে বিভিন্ন শাসনতান্ত্রিক সংস্কার করা হয়। [i] শাসন, আইন ও বিচারবিভাগকে সম্পূর্ণ পৃথক করা হয়। [ii] রাজার ক্ষমতা খর্ব করে ফ্রান্সে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। [iii] রাজা আইন রচনা, রাজকর্মচারী ও বিচারকদের নিয়োগ, ইচ্ছামতো রাজকোশের অর্থব্যয় প্রভৃতি অধিকার হারান। [iv] রাজার দৈব অধিকার বাতিল করে তাঁকে 'ফরাসি জাতির রাজা' বলে ঘোষণা করা হয়। [v] রাজা আইনসভা প্রণীত আইন বাতিল করা বা আইনসভা ভেঙে দেওয়ার অধিকার হারান। [vi] সম্পত্তির পরিমাণের ভিত্তিতে জনগণকে 'সক্রিয়' ও 'নিষ্ক্রিয়'—দুইভাগে ভাগ করে 'সক্রিয়' নাগরিকদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। [vii] সমগ্র ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্ট বা প্রদেশে এবং প্রতিটি প্রদেশকে বিভিন্ন

জেলায় বিভক্ত করা হয়। [2] অর্থনৈতিক সংস্কার: দেশের তীব্র অর্থসংকট দূর করার উদ্দেশ্যে- [i] সব ধরনের পরোক্ষ কর তুলে দেওয়া হয়। [ii] জমি ও অস্থাবর সম্পত্তির ওপর কর আরোপ করা হয়। [iii] গির্জার যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। [iv] এই বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি আমানত হিসেবে রেখে তার ভিত্তিতে 'অ্যাসাইনেট' নামে কাগজের নোট চালু করা হয়। [v] শ্রমিকদের ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।

[3] বিচারবিভাগীয় সংস্কার: [i] সামন্তপ্রভুদের বিচারালয়গুলি বিলুপ্ত হয়। [ii] জনগণের নির্বাচনের দ্বারা বিচারক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। [iii] ফৌজদারি মামলায় জুরিপ্রথা চালু হয়। [iv] বিনা বিচারে কাউকে বন্দি করা নিষিদ্ধ হয়। [v] নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়।

[4] গির্জাব্যবস্থার সংস্কার: সংবিধান সভা গির্জাব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। [i] গির্জার যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেই সম্পত্তির আমানতের ভিত্তিতে 'অ্যাসাইনেট' নামে কাগজের নোট চালু করা হয়। [ii] 'সিভিল কনস্টিটিউশন অব দ্য ক্লার্জি' বা 'ধর্মযাজকদের সংবিধান' নামক দলিল দ্বারা গির্জার ওপর পোপের যাবতীয় আধিপত্যের অবসান ঘটে। গির্জা একটি রাষ্ট্রীয় দপ্তরে পরিণত হয়। [iii] যাজকদের জনগণের দ্বারা নির্বাচন ও সরকার থেকে বেতন প্রদানের নিয়ম চালু হয়। 

মূল্যায়ন: ফরাসি সংবিধান সভা বিপ্লবকালে পুরাতনতন্ত্রের ব্যাপক ধ্বংসসাধন করে। ঐতিহাসিক কার্লটন হেইজ বলেছেন যে, "এত অল্প সময়ে এত ব্যাপক - ধ্বংসসাধন আর কোনো আইনসভা করতে পারেনি।" অবশ্য ঐতিহাসিক মাদেলাঁ বলেছেন যে, "এই ব্যাপক সংস্কারকার্য ইতিহাসে অদ্বিতীয় হলেও ! আসলে তা ছিল জীর্ণ ও ভঙ্গুর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ