হিউমের সতত সংযোগ মতবাদের মূল্যায়ন করো

হিউমের সতত সংযোগ মতবাদের মূল্যায়ন


হিউমের কার্যকারণ সম্পর্কিত সতত সংযোগ তত্ত্বের সপক্ষে সুক্ষ্ম যুক্তিতর্কের বিষয়টি উপস্থিত থাকলেও, তাঁর মতবাদটি কখনোই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর মতবাদের বিরুদ্ধে দাশনিকগণ যেসকল যুক্তিগুলি উত্থাপন করেছেন, সেগুলি হল-

মিলের আপত্তি: 

যুক্তিবিজ্ঞানী মিল দাবি করেন যে, হিউমের সতত সংযোগ তত্ত্বটিকে যদি সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে দিনকে রাত্রির এবং রাত্রিকে দিনের কারণ বলে মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা জানি যে, দিন ও রাত্রি কোনোটিই একে অপরের কারণ বা কার্য নয়। পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্যই দিন-রাত্রি সংঘটিত হয় বলে, এই দুটিকে সহকার্যরূপে গণ্য করা হয়। সুতরাং, হিউমের সতত সংযোগ তত্ত্বের ক্ষেত্রে এক বিরাট ফাঁক রয়ে গিয়েছে।

ঐতিহাসিক ঘটনার সহাবস্থানের ব্যাখ্যায় অসমর্থতা:

ঐতিহাসিক ঘটনার সহাবস্থানকে হিউমের তত্ত্বের সাহায্যে আদৌ ব্যাখ্যা করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয় যে, 'হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণই হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ', 'নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণই তাঁর পতনের কারণ'। কিন্তু হিউমের সতত সংযোগ তত্ত্বকে স্বীকার করলে বলতে হয় যে, যখনই হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করবেন, তখনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবে, অথবা যখনই নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করবেন, তখনই তাঁর পতন ঘটবে ইত্যাদি। কিন্তু এই ধরনের কথা আদৌ বলা যায় না। অর্থাৎ, হিউমের মতবাদের ক্ষেত্রে এক ধরনেল অবাস্তবতার পরিচয় পাওয়া যায়। 

কান্টের আপত্তি: 

কার্যকারণের আবশ্যিক সম্পর্ককে অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায় না বলে হিউম তাকে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু অভিজ্ঞতাই যে জ্ঞানের একমাত্র পথ নয়, তা কান্ট তাঁর তত্ত্বে প্রমাণ করেছেন। কান্টের মতে, কার্যকারণের ধারণা হল আমাদের বুদ্ধির বিশুদ্ধ আকার। তাঁর মতে, জ্ঞানের
অপরিহার্য প্রাক্শর্তরূপে কার্যকারণের ধারণাটি আমাদের মনে অবস্থান করে।

ভবিষ্যদ্বাণী মূল্যহীন: 

আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার মৌল ভিত্তি হল
যথার্থ প্রকল্প গঠন ও তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মূল্য তাই প্রকল্প গঠন ও সেই বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতার ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু হিউমের সতত সংযোগ তত্ত্বটিকে মেনে নিলে প্রকল্প গঠন ও ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষমতার বিষয়টি অকেজো হয়ে পড়ে।

মন্তব্য: এই সমস্ত যুক্তিগুলির পরিপ্রেক্ষিতে দাবি করা যায় যে, কার্যকারণ সম্পর্কিত হিউমের মতবাদটি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই ধরনের মতবাদ কার্যকারণ সম্পর্কে একপ্রকার মানসিক প্রবণতাকে সূদৃঢ় করলেও যৌক্তিক কোনো সম্পর্ককে নিশ্চিত করতে পারে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ