কান্টের বিচারবাদ কতদূর গ্রহণযোগ্য?

কান্টের বিচারবাদের গ্রহণযোগ্যতা


দার্শনিক কান্ট তাঁর বিচারবাদের মাধ্যমে জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে এক আলোড়নের সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁর বিচারবাদের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, প্রকৃত জ্ঞানের মধ্যে অভিজ্ঞতার সান্নিধ্যে যেমন নতুনত্ব থাকে, তেমনই আবার বুদ্ধির পরশে তা সার্বিক ও অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই ধরনের জ্ঞানকে তিনি যে বচনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, সেই বচনকেই বলা হয় অভিজ্ঞতা পূর্ব সংশ্লেষক বচন (Synthetic A-Priori proposition)। এ হল জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর এরূপ প্রয়াসটিও কোপারনিকাসের বিপ্লবের সঙ্গে তুলনীয়।

তা সত্ত্বেও বলা যায় যে, কান্টের এই বিচারবাদ কখনোই সমালোচনার ঊর্দ্ধে নয় এবং তাই এরূপ মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। কান্টের বিচারবাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি হল-

[1] জ্ঞানের উৎপত্তির ক্ষেত্রে দ্বৈতবাদের উদ্ভব: দার্শনিক কান্ট জ্ঞানের উৎপত্তির ক্ষেত্রে বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার আমদানি করে এক জ্ঞানতাত্ত্বিক দ্বৈতবাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি জ্ঞানের ক্ষেত্রে দুটি উপকরণের উল্লেখ করেছেন-যার একটি হল আকার (form) এবং অপরটি হল উপাদান (matter)। এই দুটি উপাদান সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। কারণ, উপাদান পাওয়া যায় বস্তুস্বরূপ থেকে ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, আর আকার পাওয়া যায় মানুষের মন থেকে বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে। তাই এরূপ বিজাতীয় বিষয়ের মধ্যে সংশ্লেষ বা সংযোগ রচনা এক অবান্তর বিষয়রূপে গণ্য।

[2] বস্তুসত্তার ক্ষেত্রেও দ্বৈতবাদের উদ্ভব: কান্টের বিচারবাদের ক্ষেত্রে বস্তুসত্তার দিক থেকেও একপ্রকার দ্বৈতবাদের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, কান্ট বলেন যে, আমরা কেবল বস্তুর অবভাসকেই জানতে পারি, বস্তুস্বরূপকে কখনোই নয়। তিনি আরও বলেন যে, বস্তুস্বরূপ আছে-এ কথা আমাদের স্বীকার করে নিতে হয়। কিন্তু এই বস্তুস্বরূপকে আমরা কখনোই জানতে পারি না। সুতরাং, প্রশ্ন ওঠে-যে বিষয়কে আমরা জানতে পারি না, তার সত্তাকে কীভাবে স্বীকার করা সংগত? এও হল এক ধরনের বস্তুসত্তার দ্বৈতবাদ যা - বিচারহীনতাকেই প্রশ্রয় দেয়।

■ [3] অজ্ঞেয়বাদের পরিচয়বাহী: সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে দেখা যায়

যে, কান্টের বিচারবাদ অজ্ঞেয়বাদের (agnosticism) পরিচয় বহন করে। ■ কারণ, জ্ঞেয় বস্তুর প্রকৃত সত্তা তথা বস্তুসত্তা যদি জানা না যায়, তবে অধিবিদ্যা ■ তথা তত্ত্বের আলোচনা নিরর্থক হয়ে পড়ে। কান্ট দাবি করেন যে, তত্ত্বালোচনা তথা অধিবিদ্যার আলোচনা আদৌ সম্ভব নয়। যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে ∎ বস্তুসত্তাকে যদি না-ই জানা যায়, তাহলে বস্তুসত্তাই যে আমাদের মধ্যে সংবেদনের সৃষ্টি করে-তা কীভাবে জানা যাবে? এর কোনো সদুত্তর দেওয়া কান্টের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং, কান্টের বিচারবাদের মধ্যেই একপ্রকার - আত্মবিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়।

[4] হেগেল কৃত সমালোচনা: প্রখ্যাত ভাববাদী দার্শনিক হেগেল তাঁর দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির (diabetic method) মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, অবভাসিত বস্তু এবং স্বরূপত বস্তুর মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো পার্থক্যই নেই। অথচ কান্ট এই দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রচনা করে বলেন যে, অবভাসিত বস্তুরূপকে জানা যায়, কিন্তু স্বরূপত বস্তুরূপকে কখনোই জানা যায় না। হেগেল আরও উল্লেখ করেছেন যে, বুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয় উভয়েই চেতনধর্মীরূপে - গণ্য এবং উভয়েই প্রকাশমূলক। সুতরাং, বিচারবাদের মূল বক্তব্যটিকে = নির্দ্বিধায় গ্রহণ করা সংগত নয়।

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন