"কারণ ও কার্যের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী সম্বন্ধ আছে'- এরূপ অভিমতটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

কারণ ও কার্যের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী সম্বন্দ্বের আলোচনা


কারণ ও কার্যের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী সম্বন্ধ আছে এরূপ অভিমতটি হল একদিকে সাধারণ মানুষের এবং অপরদিকে বুদ্ধিবাদী দার্শনিকদের। কার্যকারণের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী সম্বন্ধ বর্তমান-এবিষয়ে বুদ্ধিবাদী দার্শনিকেরা যেসকল যুক্তিগুলি দিয়েছেন-

কারণ থাকলে কার্য ঘটবেই: 


সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিবাদী দার্শনিকদের মতে, কারণ থাকলে কার্য ঘটবেই। অর্থাৎ, কার্য সবসময়ই কারণকে অনুগমন করে। কারণ ও কার্যের মধ্যে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে বুদ্ধিবাদীদের এরূপ মতবাদটি অবশ্যম্ভাবী সম্বন্ধ মতবাদ তথা অনিবার্য সম্বন্ধ মতবাদ নামে খ্যাত। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বুদ্ধিবাদী দার্শনিকগণ বিশেষ করে দেকার্ত, স্পিনোজা এবং লাইবনিজ প্রমুখ দার্শনিকগণ দাবি করেন যে, কারণ ও কার্যের মধ্যে একপ্রকার অনিবার্য তথা অবশ্যম্ভাবী সম্বন্ধ আছে। এঁরা ছাড়া ব্রড, ব্লান্ডসার্ড, ইউয়িং প্রমুখ দার্শনিকও কারণ ও কার্যের মধ্যে একটি আবশ্যিক সম্বন্ধকে স্বীকার করেছেন। এঁরা কারণ ও কার্যের অনিবার্যতাকে প্রসক্তি সম্বন্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লকও এরূপ সম্বন্ধকে স্বীকার করে নিয়েছেন। 

কার্যের সংঘটনে কারণের অনিবার্যতা: 


অবশ্যম্ভাবী সম্বন্ধ অনুসারে কারণ ও কার্যের মধ্যে একপ্রকার আবশ্যিক সম্বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ, এরূপ মতবাদ অনুযায়ী বলা যায় যে, কারণ থাকলে তার ফল হিসেবে কার্য থাকবেই। আবার কার্য থাকলে তার উৎস হিসেবে কারণ থাকবেই। এরূপ মতবাদ অনুযায়ী ক যদি খ-এর কারণরূপে গণ্য হয়, তাহলে ক ঘটলে খ অবশ্যই ঘটবে। বাস্তব উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বৃষ্টিপাত যদি মাটি ভেজার কারণরূপে গণ্য হয়, তাহলে বৃষ্টিপাত হলে মাটি ভিজবেই। এরূপ নিয়মের কোনো অন্যথা হতে পারে না।

আবশ্যিক সম্বন্ধের বৈশিষ্ট্য: 


ক নামক ঘটনা এবং খ নামক ঘটনার মধ্যে যদি অনিবার্য বা আবশ্যিক সম্বন্ধ থাকে, তাহলে যেসকল বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ করা যায়—[1] ক নামক ঘটনাটি ঘটলে খ নামক ঘটনাটিও ঘটবে। [2] ক নামক ঘটনাটির দ্বারা খ নামক ঘটনাটি সর্বদাই নিয়ন্ত্রিত হবে। [3] ক ও খ-এর অন্তঃস্থিত সম্পর্কটি হল সার্বিক। [4] এরূপ সম্বন্ধের ধারণা হল সহজাত এবং পূর্বতঃসিদ্ধ। [5] ক এবং খ-এর সম্পর্ক হল যৌক্তিক প্রসক্তির সম্পর্ক এবং [6] ক যদি সত্য হয়, তাহলে খ-ও অবশ্যই সত্য হতে বাধ্য।

উপসংহার: সাধারণ মানুষ এবং বুদ্ধিবাদী দার্শনিকরা কার্যকারণের মধ্যে আবশ্যিক বা অবশ্যম্ভাবী সম্বন্ধকে স্বীকার করে নিয়েছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা দাবি করেন যে, কার্যের ধারণাটি অনিবার্যভাবেই কারণের ধারণা থেকে নিঃসৃত। অর্থাৎ কারণটি উপস্থিত হলে কার্যটিও উপস্থিত হবেই। পরবর্তীকালে কার্য ও কারণের সম্বন্ধকে দার্শনিক ইউয়িং হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রসক্তি সম্বন্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। প্রসক্তি সম্বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে, সিদ্ধান্তটি অনিবার্যভাবে হেতুবাক্য থেকে নিঃসৃত। অনুরূপভাবে কার্যের ধারণাটিও অনিবার্যভাবে কারণের ধারণা থেকে নিঃসৃত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ