ন্যায় মতে গুণের প্রত্যক্ষ কীভাবে হয়? সংক্ষেপে আলোচনা করো।

ন্যায় মতে গুণের প্রত্যক্ষ

ন্যায় মতে, গুণ হল সেই পদার্থ যা সর্বদা একটি দ্রব্যকে আশ্রয় করে থাকে এবং যার আর অন্য কোনো গুণ নেই এবং যা নিষ্ক্রিয়রূপে গণ্য। ন্যায় মতে গুণ চব্বিশপ্রকার হলেও, আমরা কেবল রূপ (colour), রস (taste), গন্ধ, (smell), স্পর্শ (touch) ও শব্দ (sound)-এ পাঁচটি গুণের প্রত্যক্ষ কীভাবে হয় তা-ই আলোচনা করব। কারণ, রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ প্রভৃতি গুণেরই বাহ্য প্রত্যক্ষ হয়। এদের প্রত্যেকটিকে প্রত্যক্ষ করার জন্য একটি করে পৃথক ইন্দ্রিয় আছে।

রূপের প্রত্যক্ষ: 'রূপ' শুধু চক্ষু দ্বারা প্রত্যক্ষযোগ্য। আমরা যখন একটি ঘট

প্রত্যক্ষ করি, তখন ঘটের সাথে চক্ষুর সংযোগ হয়। ঘটের একটি রূপ অর্থাৎ রং আছে। ঘটের সাথে রূপের সম্বন্ধ হল সমবায় সম্বন্ধ। দুটি পদার্থের অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধকে বলা হয় সমবায় সম্বন্ধ। এরূপ সম্বন্ধ থেকে পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করতে গেলে দুটি পদার্থের অন্তত একটির অস্তিত্ব নষ্ট হবেই। তাই দ্রব্য থেকে গুণকে বিচ্ছিন্ন করতে গেলে গুণের অবশ্যই বিনাশ ঘটে। কাজেই দ্রব্য ও গুণের সম্বন্ধ হল সমবায় সম্বন্ধ এবং এরূপ সম্বন্ধের মধ্য দিয়েই আমরা রূপ প্রত্যক্ষ করি।

রসের প্রত্যক্ষ: দ্রব্যের 'রস' গুণটিকে রসনেন্দ্রিয় তথা জিহ্বার দ্বারা প্রত্যক্ষ করা হয়। রস নামক গুণটি তার আশ্রয়দ্রব্যে সমবায় সম্বন্ধে আবদ্ধ থাকে। রসময় দ্রব্যটির সাথে তাই রসনা অর্থাৎ জিহ্বার সংযোগ হয়। এর ফলে রসময় দ্রব্যটির সাথে সমবায় সম্বন্ধে যুক্ত রসের সঙ্গে জিহ্বার সংযুক্ত- সমবায় সন্নিকর্ষ ঘটে এবং এর ফলে রসের প্রত্যক্ষ হয়।

গন্ধের প্রত্যক্ষ: 'গন্ধ' প্রত্যক্ষ করা যায় কেবল ঘ্রাণেন্দ্রিয় নাসিকার দ্বারা। গন্ধের প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে নাসিকার সঙ্গে গন্ধের সংযুক্ত-সমবায় সন্নিকর্ষ ঘটে। গন্ধরাজ ফুলের সুগন্ধ প্রত্যক্ষের সময় গন্ধরাজের সাথে নাসিকার সন্নিকর্ষ হয়। গন্ধরাজে সুগন্ধ নামক গুণটি সমবেত থাকে সমবায় সম্বন্ধে। এর ফলে সুগন্ধের সাথে নাসিকার সংযুক্ত-সমবায় সন্নিকর্ষ ঘটে। এক্ষেত্রে যে দ্রব্যে গন্ধগুণ সমবেত আছে সেই দ্রব্যকে মহৎ পরিমাণ বিশিষ্ট হতে হবে, নতুবা তার গন্ধ প্রত্যক্ষ করা যাবে না। এজন্যই পরমাণুর গন্ধ প্রত্যক্ষ করা যায় না, যেহেতু পরমাণুর কোনো মহৎ পরিমাণ নেই।

স্পর্শের প্রত্যক্ষ: স্পর্শ গুণের প্রত্যক্ষ হল স্পর্শেন্দ্রিয় ত্বকের সাহায্যে। দ্রব্যের স্পর্শ গুণের প্রত্যাশার ক্ষেত্রে ত্বক ইন্দ্রিয়ের সাথে স্পর্শগুণের সংযুক্ত- সমবায় সন্নিকর্ষ ঘটে। যেমন-জলের শীতলতা গুণের প্রত্যক্ষে প্রথমে জলের সঙ্গে ত্বক-ইন্দ্রিয়ের সংযোগ ঘটে। জলে শীতলতা গুণ থাকে সমবেত হয়ে, অর্থাৎ সমবায় সম্বন্ধে যুক্ত হয়ে। এর ফলে শীতল স্পর্শের সাথে ত্বকের সংযুক্ত সমবায় সন্নিকর্ষ সংঘটিত হয়।

শব্দের প্রত্যক্ষ: 'শব্দ' গুণের প্রত্যক্ষ হয় শ্রবণেন্দ্রিয় অর্থাৎ কর্ণ নামক ইন্দ্রিয়ের দ্বারা। ন্যায় মতে, শ্রবণেন্দ্রিয় কর্ণ ব্যোম বা আকাশের দ্বারা গঠিত এবং আকাশের গুণ হল শব্দ। সেজন্যই কর্ণের সাহায্যে শব্দ প্রত্যক্ষ করা যায়। কর্ণগোলকের দ্বারা সীমাবদ্ধ আকাশই হল কর্ণেন্দ্রিয়। আকাশের গুণ শব্দ। আকাশের সঙ্গে শব্দের সম্বন্ধ হল সমবায় সম্বন্ধ। কাজেই শব্দ প্রত্যক্ষের সময় কর্ণ-ইন্দ্রিয়ের সাথে শব্দের সমবায় সন্নিকর্ষ ঘটে এবং তার ফলে আমাদের শব্দ গুণের প্রত্যক্ষ হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ