রুশ/নভেম্বর/বলশেভিক বিপ্লবের (১৯১৭ খ্রি.) বিভিন্ন গিলি সম্পর্কে কারণগুলি: আলোচনা করো।

রুশ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের রাজত্বকালে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের রুশ / নভেম্বর / বলশেভিক বিপ্লব রাশিয়া তথা বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই বিপ্লব শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষদের প্রাপ্য অধিকার দান করে রাশিয়ায় এক শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে। 

রুশ/নভেম্বর/বলশেভিক বিপ্লবের কারণ

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের রুশ/নভেম্বর/বলশেভিক বিপ্লবের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন-

[1] মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্র: ঊনবিংশ শতকে ইউরোপে প্রগতিশীল ভাবধারার প্রসার হলেও রাশিয়া তখনও ছিল একটি মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র। ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী রোমানভ বংশীয় জারগণ দেশে নিরঙ্কুশ স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। 

[2] কৃষকদের দুরবস্থা: রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার অবসান (১৮৬১ খ্রি.)

ঘটলেও কৃষকরা জমির মালিকানা না পাওয়ায় তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। কৃষকরা এখন গ্রামীণ 'মির'গুলির শোষণের শিকার হয়।

[3] শ্রমিকদের দুরবস্থা: রাশিয়ায় সামান্য বেতনে সীমাহীন পরিশ্রম, অনাহার-অর্ধাহার, বস্তি-জীবনের দুরবস্থা, শোষণ-অত্যাচার শ্রমিকদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। তারা উপলব্ধি করে যে, জারতন্ত্রের পতন না ঘটলে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতির কোনো আশা নেই।

[4] অধিকারহীনতা: জারতন্ত্রের শাসনে ভোটাধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বিভিন্ন নাগরিক অধিকার থেকে রাশিয়ার মানুষ বঞ্চিত ছিল। জারগণ বেত্রাঘাত, আটক, সাইবেরিয়ায় নির্বাসন প্রভৃতি শাস্তির মাধ্যমে দেশবাসীর যাবতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা দমন করে রাখতেন।

[5] রাসপুটিনের ভূমিকা: অপদার্থ রুশ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনব্যবস্থায় রাসপুটিন নামে এক ভণ্ড সন্ন্যাসীর ব্যাপক প্রভাব ছিল। শাসন পরিচালনা, আমলা-সেনাপতি-মন্ত্রী নিয়োগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাসপুটিনের ব্যাপক প্রভাব জনমানসে ক্ষোভের সঞ্চার করে।

[6] ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব: ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব ব্যর্থ হলেও তা 
রুশ জনগণের মধ্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এই বিপ্লব ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের পটভূমি প্রস্তুত করে। বিপ্লবী নেতা ট্রটস্কি বলেছেন, "১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব ছিল ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের 'মহড়া।"

[7] সন্ত্রাস: ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের পর জারের প্রধানমন্ত্রী পিটার স্টোলিপিন- এর নেতৃত্বে রাশিয়ায় ব্যাপক সন্ত্রাসের শাসন শুরু হয়। 'ব্ল‍্যাক হানড্রেড' নামে কুখ্যাত অপরাধীদের জেল থেকে মুক্তি দিয়ে জার-বিরোধী কৃষক- শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তাদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার বলশেভিক কর্মীকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।

[৪] রুশীকরণ নীতি: জারতন্ত্রের শাসনাধীনে রাশিয়া ছিল 'বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কারাগার'। জার রাশিয়ায় বসবাসকারী পোল, ফিন, তুর্কি, আর্মেনীয়, জর্জীয়, ইউক্রেনীয় প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীগুলির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি মুছে দিয়ে তাদের ওপর রুশ ভাষা ও সংস্কৃতি চাপানোর চেষ্টা করেন।

[9] বুদ্ধিজীবীদের অবদান: রুশ সাহিত্যিক টলস্টয়, তুর্গেনিভ, পুশকিন, গোর্কি প্রমুখের উপন্যাসগুলি রুশ যুবকদের চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনে। বুকানিন এবং কার্ল মার্কসের চিন্তাধারাও জনগণের মনে বৈপ্লবিক চেতনা জাগ্রত করে।

[10] ত্রুটিপূর্ণ বিদেশনীতি: রাশিয়ার ত্রুটিপূর্ণ বিদেশনীতি দেশবাসীর সামনে জারের শাসনের অপদার্থতা ও দুর্বলতা তুলে ধরে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদ্রাকৃতি জাপানের কাছে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে জার্মানির কাছে সুবিশাল রাশিয়ার পরাজয় দেশের আত্মসম্মান নষ্ট করে।

[11] প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব: রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিলে দেশে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। প্রায় ১ কোটি সৈন্যের খাবার, বেতন ও রসদ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ায় প্রায় ৬০ লক্ষ রুশ সেনার মৃত্যু, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব প্রভৃতি রাশিয়ায় ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

[12] এপ্রিল থিসিস: এক ভয়ংকর পরিস্থিতিতে রাশিয়ায় প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী কেরেস্কি বলশেভিকদের ওপর তীব্র অত্যাচার চালান। এই সময় বলশেভিক নেতা লেনিন বলশেভিক কর্মীদের সামনে তাঁর বিখ্যাত 'এপ্রিল থিসিস' (১৯১৭ খ্রি.) ঘোষণা করেন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পরামর্শ দেন।

মূল্যয়ন: লেনিনের পরামর্শে ট্রটস্কি-র নেতৃত্বে 'লালফৌজ' রাজধানী পেট্রোগ্র্যাড দখল করে। কেরেস্কি ভয়ে পালিয়ে গেলে বলশেভিকরা ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে রাশিয়ার শাসনক্ষমতা দখল করে। রাশিয়া বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এই সমাজতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন ভি আই লেনিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ