শব্দপ্রমাণ কী? দৃষ্টার্থক ও অদৃষ্টার্থক শব্দপ্রমাণ উদাহরণ- সহ আলোচনা করো।

শব্দপ্রমাণ

নৈয়ায়িকদের মতে, শব্দও (sabda) যথার্থ জ্ঞানলাভের একটি স্বতন্ত্র প্রমাণ। শাব্দজ্ঞানের কারণকেই বলা হয় শব্দপ্রমাণ (sabdapraman)। ন্যায় মতে, বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বচনই হল আপ্তবাক্য। আপ্ত বা বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হলেন তিনিই যিনি সত্য উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছেন এবং সত্য ভাষণে রপ্ত হয়েছেন। এরূপ আপ্তবাক্য থেকে নিঃসৃত যে জ্ঞান, তাকেই বলা হয় শাব্দজ্ঞান। মহর্ষি গৌতম তাঁর ন্যায়সূত্রে শব্দপ্রমাণের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেন, আপ্তোপদেশঃ শব্দঃ। অর্থাৎ, আপ্তব্যক্তির উপদেশ বাক্যই হল শব্দপ্রমাণ। এরূপ উপদেশ থেকে পাওয়া জ্ঞানই হল শাব্দজ্ঞান। 

আপ্তব্যক্তির উপদেশ থেকে পাওয়া জ্ঞানরূপে শাব্দজ্ঞান: ন্যায় মতে, যিনি পদার্থের যথাযথ ধর্মকে সাক্ষাৎভাবে অনুভব করেছেন, অর্থাৎ যিনি তত্ত্বসাক্ষাৎ করেছেন, তিনি নিজে যেরূপ সাক্ষাৎ অনুভব করেছেন, অপরকে ঠিক সেরূপ অভিপ্রায়েই উপদেশ প্রদান করেন, তাঁকেই বলা হয় আপ্তব্যক্তি। এরূপ আপ্তব্যাক্তির উপদেশ থেকে যে যথার্থ জ্ঞান নিঃসৃত হয়, সেই জ্ঞানকেই বলা হয় শাব্দজ্ঞান। ন্যায় মতে, যে সমস্ত বিষয় থেকে প্রত্যক্ষ, অনুমান এবং উপমান দ্বারা জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব নয়, সেই সমস্ত ক্ষেত্রে আপ্তব্যক্তির উপদেশের মাধ্যমেই শাব্দজ্ঞান লাভ করা যায়। শাব্দজ্ঞানের গুরুত্ব বেদের সময় থেকেই নিঃসৃত হয়ে আসছে। উল্লেখ করা যায় যে, বেদ মূলত শাব্দজ্ঞাননির্ভর বলেই বেদের অপর নাম হল শ্রুতি।

আপ্তের বাক্যরূপে শাব্দজ্ঞান: আপ্তব্যক্তির বাক্যকে শব্দপ্রমাণরূপে উল্লেখ করার পরিপ্রেক্ষিতে তার প্রকৃত অর্থ নিরূপণের জন্য আপ্ত এবং বাক্য শব্দ দুটির যথাযথ অর্থ অনুধাবন করা প্রয়োজন। আপ্ত শব্দের অর্থ হল যিনি পদার্থের সঠিক অর্থ জানেন এবং বাক্য শব্দের অর্থ হল আপ্তব্যক্তি সত্য প্রকাশের ইচ্ছাবশত তাঁর যথাযথ অবধারণের অনুরূপ বাক্য বলেন। অর্থাৎ আপ্তব্যক্তির যথার্থ বাক্যই হল শব্দপ্রমাণ।

দৃষ্টার্থক ও অদৃষ্টীর্থক শব্দপ্রমাণ


বাক্যের বিষয়ভেদে শব্দপ্রমাণের বিবিধরূপ: ন্যায়দর্শনে
শব্দপ্রমাণকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভক্ত করা হয়েছে। বাক্যের বিষয়ভেদে মহর্ষি বাৎস্যায়ন শব্দপ্রমাণকে [i] দৃষ্টার্থক এবং [ii] অদৃষ্টার্থক-এই দু-ভাগে বিভক্ত করেছেন। যে-সমস্ত বাক্যের অর্থ প্রত্যক্ষযোগ্য এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জাগতিক দৃষ্টযোগ্য, সেই সমস্ত বাক্যকেই বলা হয়েছে দৃষ্টার্থক শব্দ। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জাগতিক তথ্যসমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিকদের উক্তিসমূহ, উদ্ভিদের ঔষধিগুণযুক্ত আয়ুর্বেদাচার্যের উক্তি, অধীত ঘটনা সম্পর্কিত ঐতিহাসিকের উক্তি প্রভৃতি হল দৃষ্টার্থক শব্দের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অপরদিকে, মূলত অতীন্দ্রিয় জগৎ সম্পর্কে প্রযোজ্য যে-সমস্ত বাক্য, সেই সমস্ত বাক্যকেই বলা হয় অদৃষ্টার্থক শব্দ। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, বৈদিক বাক্যসমূহ, পাপ, পুণ্য, মুক্তি এবং পুনর্জন্ম প্রভৃতি সম্পর্কিত ঋষি বাক্যসমূহকে অদৃষ্টার্থক শব্দরূপে উল্লেখ করা হয়। এই ধরনের শব্দগুলি তাই কখনোই প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। এগুলি হল উপলব্ধির অধিগম্য এবং অবশ্যই অনুমানসাপেক্ষ।

বৈদিক ও লৌকিক রূপে শব্দপ্রমাণ: বক্তাভেদে শব্দকে আবার দু-ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে—[i] বৈদিক এবং [ii] লৌকিক। বেদে উত্ত বাক্যসমূহকেই বৈদিক বাক্যরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। ত্রিকালজ্ঞ সত্যদ্রষ্টা ঋষিব্যক্তির বাক্যসমূহকেও বৈদিক শব্দপ্রমাণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বেদে বিশ্বাসী ব্যক্তিরা বেদবাক্যকে অভ্রান্ত বলে মনে করেন। সে কারণেই তাঁরা দাবি করেন যে, বৈদিক বাক্যসমূহ সবসময়ই অভ্রান্তরূপে গণ্য। সে কারণেই বৈদিক বাক্যগুলিকে বলা হয় যথার্থ বৈদিক শব্দপ্রমাণ। অপরদিকে, সাধারণ বিশ্বস্ত বা আপ্তব্যক্তির বাক্যকেই লৌকিক বাক্যরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ অনাপ্তব্যক্তির বাক্য তাই কখনোই যথার্থ শব্দপ্রমাণরূপে বিবেচিত নয়। সুতরাং, আপ্তপুরুষের বাক্য তাই লৌকিকই হোক, অথবা বৈদিকই হোক না কেন, তা শব্দপ্রমাণরূপে গণ্য। 

বাক্যার্থ ও শব্দার্থ অভিমুখীরূপে শব্দপ্রমাণ: ন্যায়দর্শনে শব্দপ্রমাণের আলোচনা মূলত বাক্যার্থ ও শব্দার্থ অভিমুখী। শব্দ এবং পদ উভয়েই ন্যায়দর্শনে একার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি কোনো পদার্থকে নির্দেশ বা সংকেত করার ক্ষমতা রাখে, তাকেই বলা হয় পদ। এজন্যই বলা হয়েছে শক্তম্ পদম্ অর্থাৎ, যা শক্তিসম্পন্ন তা-ই পদ। এরূপ একাধিক পদ সমন্বয়ে গঠিত অর্থপূর্ণ উক্তিকেই বলা হয় বাক্য। শব্দের অর্থকেই বলা হয় শব্দার্থ এবং বাক্যের অর্থকেই বলা হয় বাক্যার্থ। বাক্য হল মূলত উদ্দেশ্য এবং বিধেয়র সম্বন্ধ প্রকাশক যা একটি নির্দিষ্ট অর্থকে সূচিত করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ