প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির উল্লেখ করো। এই যুদ্ধের বিভিন্ন ফলাফলগুলি উল্লেখ করো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮ খ্রি.) ছিল বিশ্বের প্রথম ভয়ংকরতম যুদ্ধ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ নষ্ট হয় তা ইতিপূর্বে কখনও হয়নি।

[1] সৈনিকদের প্রাণহানি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি সেনা অংশ নেয়, যার মধ্যে ১ কোটি ৩০ লক্ষ সেনা মারা যায়। ২ কোটির বেশি সেনা আহত হয় এবং এদের মধ্যে ৭৯ লক্ষ সেনা পঙ্গু হয়ে যায়। হতাহতদের ২/৩ অংশই ছিল মিত্রপক্ষের সেনা। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে রাশিয়ার।

[2] অসামরিক লোকের মৃত্যু: সামরিক আক্রমণ, যুদ্ধজনিত খাদ্যাভাব, মহামারি প্রভৃতির ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিকদের চেয়ে অনেক বেশি অসামরিক লোক প্রাণ হারায়। ফলে বহু দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব কমে যায়। অনেক বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীও যুদ্ধে প্রাণ হারান। ইংরেজ কবি উইলফ্রেড ওয়েন এই যুদ্ধে নিহত হন।

[3] সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানকারী দেশগুলির দৈনিক ব্যয় ছিল ২৪ কোটি ডলার এবং যুদ্ধে মোট ব্যয় হয়েছিল ২৭ হাজার কোটি ডলার। তাছাড়া সমুদ্রে জাহাজ ও জাহাজবাহী পণ্য ডুবিয়ে মূল্যবান ধাতু নষ্ট করে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ধ্বংস করা হয় তার হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গভীর ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল লক্ষ করা যায়। 

[1] ক্ষয়ক্ষতি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অন্তত ১ কোটি ৩০ লক্ষ সৈনিকের মৃত্যু হয়। অসামরিক লোকের হতাহতের সংখ্যা আরও বহুগুণ বেশি। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির দৈনিক ব্যয় ছিল ২৪ কোটি ডলার এবং যুদ্ধে মোট ২৭ হাজার কোটি ডলার অর্থ ব্যয়িত হয়। জনবল ও অর্থবলের অভাবে যুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশে দুর্দশা দেখা দেয়।

[2] জাতীয়তাবাদের স্বীকৃতি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে (১৯১৯ খ্রি.) জাতীয়তাবাদকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে এক জাতি, এক ভাষাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাষ্ট্র গঠিত হতে থাকে।

[3] গণতন্ত্রের প্রসার: যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে গণতন্ত্রের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। ডেভিড টমসন বলেছেন যে, "প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গণতন্ত্রই জয়ী হয়।" ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে ৫টি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল, এই সংখ্যা বেড়ে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে দাঁড়ায় ১৬টি।

[4] একনায়কতন্ত্রের প্রসার: যুদ্ধের পর গণতন্ত্রের প্রসারের পাশাপাশি জার্মানি, ইটালি, রাশিয়া, তুরস্ক, স্পেন প্রভৃতি দেশে একনায়কতন্ত্রেরও প্রসার ঘটে। যুদ্ধ-পরবর্তী খাদ্যাভাব, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রভৃতি একনায়কতন্ত্রের প্রসারের পথ তৈরি করে।

[5] শক্তিকেন্দ্রের পরিবর্তন: বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ছিল ইউরোপের প্রধান শক্তিশালী দেশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হয় এবং ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি জয়ী হলেও তাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ফলে তাদের পূর্ব গৌরব ও ক্ষমতা ধ্বংস হয় এবং আমেরিকা ও রাশিয়া বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। 

[6] জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা: বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যুদ্ধের পর মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের 'চোদ্দো দফা নীতি'র ওপর ভিত্তি করে 'জাতিসংঘ' বা 'লিগ অব নেশন্স' নামে এক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। 

[7] সামাজিক পরিবর্তন: যুদ্ধে অগণিত যুবকের মৃত্যুর ফলে শিল্পকারখানা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজে প্রচুর মেয়ে নিযুক্ত হয়। ফলে মেয়েদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ে। এসময় শ্রমিকশ্রেণিরও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ