বাচনিক জ্ঞান বলতে কী বোঝ? বাচনিক জ্ঞানের শর্তগুলি আলোচনা করো।

বাচনিক জ্ঞান


 'জানা' নামক ক্রিয়াপদটির তিনটি প্রয়োগক্ষেত্র বিদ্যমান-পরিচিতিমূলক জ্ঞান, কর্মকুশলতামূলক জ্ঞান এবং বাচনিক জ্ঞান। বাচনিক জ্ঞান হল অপর দুইপ্রকার জ্ঞানের আবশ্যিক শর্ত (Necessary condition)। তাই বলা যায়, এই তিনপ্রকার জ্ঞানের মধ্যে বাচনিক জ্ঞানই হল মূল এবং অপর দুটি হল তার সহযোগী মাত্র। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে এই বাচনিক জ্ঞানের উপরই অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অপর দুইপ্রকার জ্ঞানকে যদি জ্ঞানের বা 'জানার' পর্যাপ্ত বা সম্ভাব্য শর্ত (Sufficient condition) রূপে অভিহিত করা হয়, তবে বাচনিক জ্ঞানকে অবশ্যই অনিবার্য বা আবশ্যিক শর্তরূপে গণ্য করা উচিত।

বাচনিক জ্ঞানের শর্তসমূহ


দর্শনের ক্ষেত্রে আমরা জ্ঞান বলতে মূলত বাচনিক জ্ঞানকেই বুঝে থাকি। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন্ কোন্ শর্ত উপস্থিত থাকলে বাচনিক জ্ঞান লাভ করা যায়? অথবা, বলা যেতে পারে যে, বাচনিক জ্ঞানের কোন্ কোন্ শর্তগুলির মধ্যে একটিও অনুপস্থিত থাকলে জ্ঞান হবে না? অথবা বলা যায় যে, পর্যাপ্ত শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে কোন্ কোন্ শর্ত উপস্থিত থাকলে বাচনিক জ্ঞান লাভ করা যাবে? আরও সহজ করে বলা যায়, বাচনিক জ্ঞানের আবশ্যিক ও পর্যাপ্ত শর্তগুলি কী?

ধরা যাক, P হল একটি বচন। এই P নামক বচনটিকে জানার পশ্চাতে কতকগুলি শর্ত থাকে। এই শর্তগুলির পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা P নামক বচনটিকে জানি বলে দাবি করি। এ প্রসঙ্গে জন হসপার্স উল্লেখ করেন যে, কোনো বচন যথা P-কে সত্য বলে জানতে গেলে তিনটি শর্তকে অবশ্যই পূরণ করতে হয়। এই তিনটি শর্ত হল-
[1] P নামক বচনটি অবশ্যই সত্য হবে।

[2] P নামক বচনটির সত্যতায় জ্ঞাতার বিশ্বাস থাকবে এবং

[3] P নামক বচনটি যে সত্য, তার সমর্থনে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ বা যুক্তি থাকতে হবে।

[1] বাচনিক জ্ঞানের প্রথম শর্ত: প্রথম শর্তটির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা

যখন কোনো বিষয় বা বচনকে জানি বলে দাবি করি, তখন সেই বচনটিকে অবশ্যই সত্য হতে হবে। কারণ, ওই বচনটি যদি বাস্তবে মিথ্যারূপে গণ্য হয়, তবে তাকে আমরা জেনেছি বলে কখনোই দাবি করতে পারি না। এরূপ শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে তাই বাচনিক জ্ঞানের বিষয়টিকে প্রদত্ত উদাহরণের সাহায্যে উপস্থাপিত করা যায়-

S জানে P-কে।

.. P হয় সত্য। অথবা P নয় সত্য।

.. S জানে না P-কে।

[2] বাচনিক জ্ঞানের দ্বিতীয় শর্ত: বাচনিক জ্ঞানের দ্বিতীয় শর্তের

পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যখন কোনো বচন (P)-কে জানি বলে দাবি করি, তখন বচনটিকে কেবল সত্য হলেই হবে না, বচনটির সত্যতায় জ্ঞাতার বিশ্বাসও থাকতে হবে। এরূপ শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে তাই বাচনিক জ্ঞানের বিষয়টিকে প্রদত্ত উদাহরণের সাহায্যে উপস্থাপিত করা যায়-

..S জানে যে P সত্য।

. S বিশ্বাস করে যে P সত্য।

[3] বাচনিক জ্ঞানের তৃতীয় শর্ত: বাচনিক জ্ঞানের তৃতীয় শর্তের

পরিপ্রেক্ষিতে কোনো একটি বচন হয়তো সত্য হতে পারে, আবার ওই বচনটির সত্যতায় জ্ঞাতার বিশ্বাসও থাকতে পারে কিন্তু তা সত্ত্বেও বচনটি কখনোই জ্ঞানের মর্যাদা লাভ করতেও পারে না। কারণ, এরূপ বিশ্বাসের সমর্থনে উপযুক্ত তথ্য বা সাক্ষ্যপ্রমাণ চাই। উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া বচনটির ক্ষেত্রে কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। এভাবেই আমরা বলতে পারি যে, তথ্যনিষ্ঠ সত্যবিশ্বাসই হল জ্ঞান। সুতরাং, জ্ঞানের বিষয়টিকে প্রদত্ত আকারে উপস্থাপিত করা যায়-

জানা বা জ্ঞান = সত্যতা + বিশ্বাস+ যথার্থ সাক্ষ্যপ্রমাণ বা তথ্যপ্রমাণ।

বাচনিক জ্ঞানের আবশ্যিক ও পর্যাপ্ত শর্ত

বাচনিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে ওপরের যে তিনটি শর্তের উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকটি শর্তই জানার ক্ষেত্রে আবশ্যিক শর্তরূপে গণ্য হয়। কারণ, এই তিনটি শর্তের একটিও যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে কখনোই জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। আর যে শর্তের অনুপস্থিতির ফলে জ্ঞানটিরও অনুপস্থিতি ঘটে, তাকেই বলা হয় আবশ্যিক শর্ত। অপরদিকে, বাচনিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে কেবল এই তিনটি শর্ত থাকলেই জ্ঞানলাভ হতে পারে বলে এদের একসঙ্গে বলা হয় জানার বা জ্ঞানের পর্যাপ্ত শর্ত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন