জ্ঞানের উৎপত্তি সংক্রান্ত লাইবনিজের অভিমত কী?

জ্ঞানের উৎপত্তি সংক্রান্ত লাইবনিজের অভিমত


প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক লাইবনিজ হলেন চরম বুদ্ধিবাদী দার্শনিক। তাঁর মতে, বুদ্ধিই হল জ্ঞানের মৌল উৎস। কারণ, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার দ্বারাই যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায়। পূর্বসূরিদের মতো তিনিও দাবি করেন যে, অভিজ্ঞতার দ্বারা আমরা কখনোই যথার্থ জ্ঞান পেতে পারি না। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা যে জ্ঞান লাভ করি, তা অবশ্যই অযথার্থ ও সংকীর্ণ। শুধু বুদ্ধিই হল যথার্থ জ্ঞানের নির্ণায়ক। বুদ্ধি ছাড়া আর অন্য কোনোভাবেই প্রকৃত জ্ঞানলাভ সম্ভব নয়।

জ্ঞানের প্রকারভেদ: 


লাইবনিজ বুদ্ধিলব্ধ সত্য (truths of reason) এবং তথ্যলব্ধ সত্য (truths of fact)-এই দু-প্রকার জ্ঞানের উল্লেখ করেছেন।

[1] বুদ্ধিলব্ধ সত্য: লাইবনিজের মতে, প্রথমপ্রকার সত্য প্রকাশিত হয় আবশ্যিক বচনের মাধ্যমে। কারণ, আবশ্যিক বচনগুলি স্বতঃসিদ্ধ (self-evident) অথবা তার থেকে নিঃসৃত বচনরূপে গণ্য। আবশ্যিক বচনগুলির বিরোধী বচনগুলি অবশ্যই মিথ্যা হয়। সুতরাং, সমস্ত বুদ্ধিলব্ধ সত্য আবশ্যিকভাবেই সত্য এবং সেগুলির সত্যতা বিরোধনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। 
[2 ] তথ্যলব্ধ সত্য: তথ্যলব্ধ সত্যগুলি কখনোই আবশ্যিক বচনের

মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে না। এই ধরনের জ্ঞানের সত্যতা অভিজ্ঞতালব্ধ আপতিক বচনের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। কারণ, এরূপ জ্ঞানগুলি আপতিকরূপেই গণ্য। অর্থাৎ, এই ধরনের জ্ঞান কখনো-কখনো সত্য, আবার কখনো-কখনো মিথ্যারূপে গণ্য। এই সমস্ত আপতিক বচনের বিরোধী বচন সর্বদাই সম্ভব। সুতরাং, তথ্যলব্ধ জ্ঞানের সত্যতা কখনোই আবশ্যিক নয় এবং সেকারণেই এর বিপরীত বচন কল্পনা করা সম্ভব। এই জাতীয় বচন বা জ্ঞান কখনোই বিরোধনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়, তা পর্যাপ্ত হেতুর নীতির (principle of sufficient reason) ওপর প্রতিষ্ঠিত।

দেকার্ত ও স্পিনোজার মতের সঙ্গে পার্থক্য: 


লাইবনিজ একজন আধুনিক বুদ্ধিবাদী দার্শনিকরূপে গণ্য হলেও, অপর দুই আধুনিক বুদ্ধিবাদী দার্শনিক দেকার্ত এবং স্পিনোজার মত থেকে তিনি কিছুটা স্বতন্ত্র বা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কারণ, দেকার্ত এবং স্পিনোজার মতে, আমাদের কোনো কোনো ধারণা হল সহজাত (innate), কিন্তু লাইবনিজের মতে, আমাদের সমস্ত ধারণাই হল সহজাত।

মনাদ-ই বুদ্ধিলব্ধ দ্রব্য: 


লাইবনিজের মতে, চিদাণু বা চিৎ-পরমাণুই হল
দ্রব্য এবং তা সংখ্যায় অগুনতি। বিশ্বজগৎ অসংখ্য চিৎ-পরমাণু সমন্বিত। চিৎ- পরমাণুগুলি হল আত্মার স্ফুলিঙ্গস্বরূপ আধ্যাত্মিক একক এবং এগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এগুলিকেই তিনি মনাদ (monad) রূপে উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেকটি মনাদ নিজ নিজ শক্তিতে তার অন্তস্থ সুপ্ত জ্ঞানের বিকাশ ঘটায়। মনাদের যাবতীয় ধারণা মনের মধ্যেই অব্যক্তভাবে উপস্থিত থাকে। আমাদের মানসিক ক্রিয়ার মাধ্যমেই সেগুলি ব্যক্ত হয়। সুতরাং, আমাদের সমস্ত ধারণাই হল সহজাত এবং সমস্ত যথার্থ জ্ঞান হল সহজাত ধারণাপ্রসূত। এগুলি কেবল বুদ্ধির দ্বারাই লাভ করা যায়।

সে কারণেই তিনি অভিজ্ঞতাবাদী জন লকের মতবাদ খণ্ডন করে বলেন- "বুদ্ধিতে এমন কিছু নেই যা পূর্বে ইন্দ্রিয়ের মধ্যে ছিল না কেবল বুদ্ধি ছাড়া (there is nothing in the intellect which was not previously in the sense, except the intellect itself.)"। এভাবেই দেখা যায় যে, লাইবনিজের মতবাদের মধ্যে চরম বুদ্ধিবাদের প্রকাশ ঘটেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন