জল সম্পদ সংরক্ষণ ও জলবিভাজিকার ব্যবস্থাপনা

জল সম্পদ সংরক্ষণ ও জলবিভাজিকার ব্যবস্থাপনা (Conservation of Water Resources and Watershed Management)


পৃথিবীর সাগর ও মহাসাগরগুলিতে জল সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় 97% ও স্বাদু জলের পরিমাণ মাত্র 3%। এই স্বাদু জলের আবার 69% হিমবাহ ও বরফের চাদরে সঞ্চিত আছে এবং প্রায় 30% ভৌমজল হিসাবে সঞ্চিত হয়ে রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় 0.9% জলের 87% হ্রদে, 11% জলাভূমিতে এবং 2% নদনদীতে সঞ্চিত আছে। পৃথিবীতে জল হল এমন একটি উপাদান, যা তরল, কঠিন ও বাষ্পীয়-এই তিন অবস্থাতেই থাকতে পারে। পর্যাপ্ত মাত্রায় জলের অভাবে জীবজগতের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা যায় এবং বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জলসম্পদের প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে সমস্যা লক্ষ করাও যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জল সংরক্ষণ ও জলবিভাজিকার ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


জল সম্পদ সংরক্ষণ (Conservation of Water Resources)


• সংজ্ঞা: যে পদ্ধতিতে জলের অপচয় রোধ, নিয়ন্ত্রিত ও কাম্য ব্যবহার, পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তিসংগত ও সুপরিকল্পিতভাবে জলকে ব্যবহার করা যায়, তাকে জল সংরক্ষণ বলে। 

সংরক্ষণের পদ্ধতিসমূহ: নিম্নলিখিত বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্যে জল সম্পদ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে জলের চাহিদা হ্রাস: দৈনন্দিন জীবনে মানুষের বিভিন্ন কার্যাবলির জন্য প্রয়োজনীয় জলের চাহিদা কমানো প্রয়োজন। বাঁধ ও জলাধার গঠন: নদীতে বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করে জল সঞ্চয় করা যেতে পারে এবং ওই জলকে বহুমুখী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে জল সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।

• জলসেচের কাম্য ব্যবহার: নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বিশেষত বিন্দু ও ফোয়ারা পদ্ধতির সাহায্যে জলসেচ করলে প্রায় 32% জলের অতিব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয়। জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নতিবিধান: নর্দমার জল যাতে কোনোভাবে জলাশয়ের জলকে দূষিত করতে না পারে, তার জন্য নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন করা প্রয়োজন। লবণমুক্তকরণ: সাম্প্রতিককালে পৃথিবীতে সমুদ্রের লবণমুক্ত জলের সামগ্রিক পরিমাণ দৈনিক গড়ে প্রায় 4.5 কোটি গ্যালন। প্রধানত রিভার্স ওসমোসিস্ ও মাইক্রোফিলট্রেশন পদ্ধতি সমুদ্রের জলকে লবণমুক্ত করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজন পূরণ করা হয়। দূষিত জলের পরিশোধন: দূষিত জলকে পরিশোধন কেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিশোধনের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। • ভৌমজলের কাম্য ব্যবহার: ভূপৃষ্ঠস্থ জলের তুলনায় ভৌমজলের পরিমাণ বেশি থাকায় ভৌমজলের কাম্য ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হয়। ভৌমজলের নতুন উৎসের অনুসন্ধান: ভৌমজলের নতুন নতুন উৎসস্থল খুঁজে বের করে সেখানকার জলকে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ: বৃষ্টির জল সংরক্ষণ হল এমন একটি পদ্ধতি যেখানে বৃষ্টির জলকে সরাসরি ভূপৃষ্ঠস্থ জলাভূমিতে বা বাড়ির ছাদে সংগ্রহ করে গৃহস্থালি, কৃষি ও শিল্পের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার এবং জল সঞ্চয় ও সংরক্ষণ করা হয়। এর পরবর্তী পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বৃষ্টির জলকে পরিশোধন করে গৃহস্থালি, পানীয় ও শিল্পের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয় এবং কৃত্রিম উপায়ে ভূ-অভ্যন্তরে এই জলকে স্থানান্তরিত করে ভূপৃষ্ঠে জলের ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জলের চাহিদা মেটানোর জন্য অত্যন্ত সহজ ও সুলভ পদ্ধতি হল বৃষ্টির জল সংরক্ষণ। বন্যাপ্রবণ নদীর

সঙ্গে সংযোগস্থাপন: বন্যাপ্রবণ নদীর সঙ্গে খালের মাধ্যমে বা বড়ো জলাধার তৈরি করে তার সঙ্গে। শুষ্ক নদীগুলিকে

সংযুক্ত করার মাধ্যমে বন্যার অতিরিক্ত জলকে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। জলাশয় ও জলাভূমির সংস্কারসাধন:

মজে যাওয়া জলাশয় ও জলাভূমিগুলির সংস্কারসাধন করা হলে বৃষ্টির অতিরিক্ত জল সঞ্চয় ও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। 

জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা (Watershed Management)


জলবিভাজিকার সংজ্ঞা: বিভিন্ন জলবিজ্ঞানী ও ভূমিরূপবিদদের মতে, দুটি সংলগ্ন নদী প্রণালীর মধ্যে

অবস্থানকারী বিভাজন রেখা, যেমন-শৈলশিরাকে জলবিভাজিকা বলে। একটি নদীর ধারণ অববাহিকা জলবিভাজিকার মাধ্যমে অন্য একটি নদীর ধারণ অববাহিকা থেকে পৃথক হয়। উদাহরণ: গ্যা নদীর ধারণ অববাহিকার উত্তর ও দক্ষিণে যথাক্রমে হিমালয় পর্বত ও বিন্ধা-মৈকাল-কাইমুর পর্বত। জলবিভাজিকা নদীর ধারণ অববাহিকার আয়তন, সীমানা ও অবস্থান জানতে সাহায্য করে।

জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনার ধারণা: জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা বলতে কোনো একটি নদীর ধারণ অববাহিকার বাস্তুতান্ত্রিক ও আর্থসামাজিক উপাদানের উন্নতি বিধানের জন্য গৃহীত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক পরিকল্পনাকে বোঝানো হয়। অন্যভাবে বলা যায়, নদীর ধারণ অববাহিকার প্রাকৃতিক ও আর্থসামাজিক পরিবেশের স্থিতিশীল উন্নয়নের জন্য যে সামগ্রিক ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তাকে জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা বলে। উদাহরণ: দামোদর নদীর ওপর বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা এইরূপ ব্যবস্থাপনার অন্যতম উদাহরণ।

ধারণ অববাহিকা: নদী যে অঞ্চলের জল বয়ে নিয়ে
যায়, তাকে ওই নদীর ধারণ অববাহিকা বলে। উদাহরণ: গঙ্গা, যমুনা প্রভৃতি নদীর অববাহিকা।

• বৈশিষ্ট্য: (i) ধারণ অববাহিকার আয়তন জলচক্রের

বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণে সাহায্য করে। (ii) নদীর ক্রম অনুযায়ী এই অববাহিকা অবস্থান করে। (iii) বৃষ্টির জল এখানে ইনপুট রূপে যুক্ত হয় এবং পরে ওই জলের পৃষ্ঠপ্রবাহ বা অনুসরণের মাধ্যমে আউটপুট রূপে নির্গমন ঘটে।

• উদ্দেশ্যসমূহ: জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনার প্রধান

উদ্দেশ্যগুলি হল- ভূমিক্ষয় নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বনসৃজন। ② ভৌমজলের সঞ্চয় সুরক্ষিতকরণ। ③ নালি ক্ষয় প্রতিরোধ। ④) বৃষ্টির জল সংরক্ষণ। বর্ষাকালে অববাহিকা থেকে জল নিষ্কাশন। ভূমির ব্যবহার। গ্রহণ। অববাহিকার ভূমির প্রকৃতি অনুসারে যুক্তিসংগত অববাহিকার প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও কাম্য ব্যবহার। (৫) জল সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষাবিধান।

• জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি: জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিকে অঞ্চলের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়- আর্দ্র অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা ও শুষ্ক অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা।

• আর্দ্র অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা (Management of Hu- mid Region): আর্দ্র অঞ্চলে জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপর্যয়গুলি প্রতিরোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। (a) বন্যা। বর্ষাকালে অনেক সময় অতিবৃষ্টির ফলে ধারণ অববাহিকায় বন্যা সৃষ্টি হয় এবং প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। ব্যবস্থাপনাঃ (1) নদীর খাত থেকে পলি নিষ্কাশন করতে হবে, (ii) নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করা যেতে পারে, (iii) ধসের জন্য নদীর স্বাভাবিক গতিপথে যাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। (b) ভূমিধস: পাহাড়ি অঞ্চলে শিলাচূর্ণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে প্রবল বেগে নীচের দিকে নেমে এসে ভূমিধস সংঘটিত করে। 
ব্যবস্থাপনা: (i) পাহাড়ি ঢালে বনসৃজন করতে হবে। (ii) ইঞ্জিনিয়ারিং দেয়াল গঠন করা যেতে পারে। (iii) জুট নেটিং ও রিপ-র‍্যাপ ড্রেন তৈরি করতে হবে। (iv) খাড়া ঢালে ধাপ কেটে ঢালের নতির পরিবর্তন করা যেতে পারে। (c) মৃত্তিকাক্ষয়: প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে মৃত্তিকা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং নদীর গভীরতা হ্রাস পায়। ব্যবস্থাপনা: (১) ধারণ অববাহিকায় মৃত্তিকাকে বৃষ্টির জলের আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য বনসৃজন করতে হবে। (ii) জলবিভাজিকা সংলগ্ন স্থানেও বনসৃজন করা প্রয়োজন। (iii) জলবিভাজিকার পাশের দেয়াল থেকে যাতে জল না পড়ে তার জন্য দেয়াল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাতে হবে। 

• শুষ্ক অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা (Management of Dry Region): 

শুষ্ক অঞ্চলে প্রধানত জলের কাম্য ব্যবহার, আধুনিক কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার, মৃত্তিকার আর্দ্রতার সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বার্থরক্ষা প্রভৃতি বিভিন্ন উদ্দেশ্যপূরণের জন্য জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা করা হয়। ব্যবস্থাপনা: (i) শুষ্ক অঞ্চলে জলের অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য নদীখাতকে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করতে হবে। (ii) শুষ্ক ঋতুতে জলাশয় বা আর্দ্র মৃত্তিকার উপরে আচ্ছাদন ব্যবহার করে বাষ্পীভবনের হার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। (iii) যেসব ফসল উৎপাদনে জল কম ব্যবহৃত হয়, সেইসব ফসলের (যেমন-ভুট্টা, মিলেট প্রভৃতি) চাষ বৃদ্ধি করতে হবে। (iv) জলবিভাজিকা সংলগ্ন অঞ্চলে খাত ও জলাশয় খনন করে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করতে হবে। (v) ভূমি কর্ষণ ও শুষ্ক কৃষির বিষয়ে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ