যুক্তির স্বরূপ বা প্রকৃতি

যুক্তির স্বরূপ বা প্রকৃতি (Nature of Argument)


1) জ্ঞানলাভের একটি প্রক্রিয়ারূপে যুক্তি বা অনুমান: 

যুক্তি অথবা অনুমান হল জ্ঞানলাভের একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া হল একটি যথার্থ বা সঠিক প্রক্রিয়া। এধরনের প্রক্রিয়া বাঁধাধরা নিয়মের অনুশাসন মেনে চলতে চায়। কোনো কারণে যদি নিয়ম মেনে চলা না হয়, তাহলে এই প্রক্রিয়া কখনোই সুফল দেয় না। তাই ঠিক ঠিক নিয়ম মেনে যদি কোনো যুক্তি অথবা অনুমান গঠন করা হয়, তাহলে তা থেকে যথার্থ জ্ঞান পাওয়া যায়। কিন্তু নিয়মগুলিকে যথাযথভাবে না মানলে যুক্তি অথবা অনুমানের ক্ষেত্রে ভ্রান্তি দেখা দেয়। সেকারণেই যুক্তি অথবা অনুমানের নিয়মগুলি সম্পর্কে আমাদের যথাযথ ও সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার। তর্কবিদ্যা আমাদের সেই নিয়মগুলি সঠিকভাবে জানতে সাহায্য করে। সুতরাং তর্কবিদ্যার কাজ হল, সেই সমস্ত নিয়মের সন্ধান দেওয়া, যেগুলিকে অনুসরণ করলে যুক্তি বা অনুমান যথার্থ হয়।


2) যুক্তি বা তর্কের বিষয় কোনো মানসিক প্রক্রিয়া নয়:

 তর্কবিদ্যায় আমরা কোনো মানসিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করি না। কারণ, মানসিক প্রক্রিয়া হল নেহাত-ই কোনো মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় এবং তা অপরের কাছে অপ্রকাশিত। সুতরাং শুধুমাত্র কোনো মানসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আবদ্ধ অনুমান হল একটি অস্পষ্ট বিষয়। কিন্তু ভাষায় প্রকাশিত যে অনুমান, তা অবশ্যই একটি স্পষ্ট বিষয়। তর্কবিদ্যা বা যুক্তিবিদ্যা হল ভাষায় প্রকাশিত অনুমান এবং এর চর্চার মধ্য দিয়ে কোনো বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান লাভ করা যায়। সেই কারণেই তর্কবিদ্যার আলোচ্য বিষয় হল যুক্তি (Argument), শুধুমাত্র মনে থেকে যাওয়া অনুমান নয়। তবে, তর্কবিদ্যার আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় যুক্তির পরিবর্তে অনুমান শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। সেক্ষেত্রে অনুমান এবং যুক্তি-এই শব্দ দুটি সাধারণভাবে সমার্থক শব্দরূপে গণ্য হয়। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমান বলতে কোনো মানসিক প্রক্রিয়াকে না বুঝিয়ে ভাষায় প্রকাশিত অনুমানকেই বোঝানো হয়।


3) বচনের সত্যমিথ্যা নির্ধারণের প্রক্রিয়ারূপে যুক্তি বা অনুমান: একটি বচনের সত্য-মূল্য হল দুটি- সত্য (True) অথবা মিথ্যা (False)। বচনের সত্যতা নির্ণীত হতে পারে নানা উপায়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি প্রত্যক্ষের সাহায্যেই বচনের সত্যতা নির্ণয় করা যায়। যেমন আমরা যদি বলি- "সরষে ফুলের রং হয় হলুদ", এই বচনের সত্যতাকে আমরা প্রত্যক্ষের মাধ্যমেই জানতে পারি। অনেক ক্ষেত্রে আবার একটি বচনের সত্যতা তার অন্তর্গত একাধিক বচনের সত্যতার দ্বারা নির্ণয় করা যায়। এই অন্তর্গত বচনগুলিকেই অংশ বচন বলা হয়। যেমন-"সক্রেটিস ছিলেন প্লেটোর শিক্ষক ও সক্রেটিস ছিলেন একজন গ্রিক"-এই বচনটির সত্যতা "সক্রেটিস ছিলেন প্লেটোর শিক্ষক" এবং "সক্রেটিস ছিলেন একজন গ্রিক"- এই দুটি অংশ বচনের সত্যতা থেকে জানা যায়। এক্ষেত্রে যেগুলিকে আমরা অংশ বচন-রূপে উল্লেখ করেছি- সেগুলি থেকে আমরা এও অনুমান করে নিতে পারি যে, "প্লেটোর শিক্ষক ছিলেন একজন গ্রিক"। এইভাবে বলা যায় যে, বচনের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের প্রক্রিয়া হল অনুমান। আবার অনুমানের ভাষায় ব্যক্ত রূপকেই বলা হয় যুক্তি (Argument) |


4) যুক্তিবাক্য ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কিত বচনসমষ্টি হিসেবে যুক্তি বা তর্ক: যুক্তি বা তর্ক হল বচন সমষ্টির এমনই এক কাঠামো, যেখানে কমপক্ষে দুটি অথবা তার বেশি বাক্য বা বচন থাকে। এই সমস্ত বচনের মধ্যে শেষের বচনটিকে বলা হয় সিদ্ধান্ত (Conclusion) এবং বাকি বচন বা বচনগুলিকে বলা হয় যুক্তিবাক্য বা হেতুবাক্য

(Premises)। কোনো যুক্তি বা তর্কের ক্ষেত্রে বচনগুলির যুক্তিবাক্য এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে অবশ্যই সম্পর্ক থাকে।


আমাদের সিদ্ধান্ত: যুক্তির সিদ্ধান্ত সত্য বা সম্ভাব্য যেভাবেই গণ্য হোক না কেন, এ কথা সত্য যে, কোনো যুক্তির সিদ্ধান্তটি অবশ্যই যুক্তিবাক্য বা আশ্রয়বাক্যের দ্বারা সমর্থিত। অর্থাৎ, যুক্তিবাক্যের অবশ্যই সিদ্ধান্তটিকে সমর্থন করার যোগ্যতা রয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যুক্তি হল আশ্রয়বাক্যের সঙ্গে সিদ্ধান্তকে যুক্ত করার এক প্রক্রিয়া। সেকারণেই অনেক সময় বলা হয় যে, তর্কবিদ্যা বা যুক্তিবিদ্যা হল সিদ্ধান্ত নির্ণয়ের এক কৌশল (Logic is the art of drawing conclusions) |


5) বৈধ ও অবৈধ-রূপে যুক্তি: যে-কোনো যুক্তি বৈধ (Valid) হতে পারে, আবার তা অবৈধ (Invalid)-ও হতে পারে। যুক্তিবাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি যদি অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়, তবে যুক্তিটি বৈধ (Valid) হয়; আর তা যদি না হয়, তবে তা অবৈধ (Invalid)-রূপে গণ্য হয়।


6) যুক্তির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে সিদ্ধান্ত: যুক্তির ক্ষেত্রে আমরা অনুমানের বিষয়টিকে যে বচনের মাধ্যমে প্রমাণ করি, তাকেই বলা হয় সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তই হল যুক্তির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। যুক্তির ক্ষেত্রে আমরা সিদ্ধান্তটিকে সবার শেষে প্রতিষ্ঠা করি। সিদ্ধান্তের বক্তব্যই হল যুক্তির মূল বক্তব্য।


7) সিদ্ধান্তের সাহায্যকারী-রূপে হেতুবাক্য: যে সমস্ত বাক্য বা বচনের সাহায্যে আমরা সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠা করে থাকি, সেগুলিকে বলা হয় যুক্তিবাক্য বা হেতুবাক্য। যুক্তিবাক্য বা হেতুবাক্যের সংখ্যা এক বা একাধিক হতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তের সংখ্যা সর্বদা একটিই হয়। যুক্তিবাক্য বা হেতুবাক্যের সত্যতার ওপর সিদ্ধান্তের সত্যতা নির্ভর করে। অর্থাৎ, যুক্তিবাক্য বা হেতুবাক্য সত্য হলে সিদ্ধান্তটিও অনিবার্যভাবে সত্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন