মিশরের জলসেচ

সাহারা সমভূমির পূর্বদিকে অবস্থিত মিশর মরু জলবায়ুর প্রভাবাধীন একটি দেশ। দেশের অনেকাংশই উল্ল, রুক্ষ, শুষ্ক ও বালুকাময়। তবে এই মরুদেশটি কৃষিকাজের উপযোগী হয়ে উঠেছে নীলনদের প্রভাবে। প্রধানত নীলনদের জলের সাহায্যেই মিশরে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। 

মিশরে জলসেচের প্রয়োজনীয়তা (Necessity of Irrigation in Egypt)


① মিশরের অধিকাংশ স্থান মরুভূমি ও মরুপ্রায় অঞ্চলের অন্তর্গত হওয়ায় এখানে ফসল উৎপাদনের জন্য জলসেচ ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন। ② মিশরের অর্থনীতি অনেকাংশ কৃষিনির্ভর। তাই আখ, কার্পাস, প্রভৃতির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জলসেচের প্রয়োজন। ③ নীলনদ ছাড়া মিশরে অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য নদী না থাকায় জলসেচ ব্যবস্থার ভূমিকা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ④ মিশরের বছরে গড়ে প্রায় 25 সেমি-এর কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে জলসেচের প্রয়োজন হয়। ⑤ বালুকাময় মৃত্তিকার জলধারণ ক্ষমতা কম হওয়ায় সারাবছর কৃষিজমিতে জলসেচের দরকার হয়। 

মিশরে জলসেচের বিভিন্ন কৌশল (Different Techniques of Irrigation)


মিশরে নীলনদের অপরিসীম গুরুত্বের বিচারে মিশরকে 'নীলনদের দান' (Gift of the Nile) বলা হয়। মিশরের জলসেচ পদ্ধতি প্রধানত নীলনদকে ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানকার প্রধান জলসেচ পদ্ধতিগুলি হল-
(1) খাল জলসেচ (Canal Irrigation): মিশরে নীলনদের নিম্ন প্রবাহে খাল সেচের প্রচলন আছে।
শ্রেণিবিভাগ : মিশরের খালের বিন্যাস ও জলপ্রবাহের 
পরিমাণের ভিত্তিতে খালকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। (a) মুখ্য খাল (Principal Canal): নীলনদ থেকে সরাসরি খনন করা খাল। (b) প্রধান/প্রথম স্তরের খাল (Main/First Level Canal) : মুখ্য খাল থেকে খনন করা হয় এবং দুই প্রকার খালই নিত্যবহ প্রকৃতির। (c) দ্বিতীয় স্তরের খাল/শাখা খাল (Second Level Canal/ Branch Canal) : প্রথম স্তরের খাল থেকে খনন করা হয়। (d) তৃতীয় স্তরের খাল/বণ্টন খাল (Third Level Canal/ Distribution Canal): দ্বিতীয় স্তরের খাল থেকে খনন করা হয়
এবং সেখান থেকে মোহানা অঞ্চলে জল বণ্টিত হয়। একে মেসকাস্ (Mesqus)-ও বলা হয়। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের খালগুলিতে দুই প্রকার পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি (Rotation System)-তে জল সঞ্চিত হয়। যেমন-(1) দ্বি-আবর্তন পদ্ধতি (Two-turn Method)। এক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির খালে সাতদিন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির খালে

পরবর্তী সাতদিন জল সঞ্চিত থাকে। অর্থাৎ খালগুলিকে দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। (ii) ত্রি-আবর্তন পদ্ধতি (Three-turn 
Method): এই পদ্ধতি অনুযায়ী খালকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি শ্রেণির খাল প্রথম পাঁচদিন উন্মুক্ত ও পরের দশদিন বন্ধ করা থাকে। 
(2) স্থায়ী জলসেচ পদ্ধতি (Permanent Irrigation System): নীলনদের উপরে নির্মিত বিভিন্ন সেচবাধ ও জলাধারের মাধ্যমে মিশরের বিশালায়তন জমিতে ধান, কার্পাস, গম, ভুট্টা, তৈলবীজ প্রভৃতি উৎপাদন করা হয়। মিশরের
বাঁধগুলির মধ্যে অন্যতম হল উচ্চ আসোয়ান বাঁধ, অ্যাসিয়ট ব্যারেজ, এসনা ব্যারেজ প্রভৃতি এবং নাসের হ্রদ হল এখানকার বিখ্যাত জলাধার। 
(3) অস্থায়ী অববাহিকা জলসেচ পদ্ধতি (Temporary Basin Irrigation System): প্রচুর পরিমাণে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হলে নীলনদের বদ্বীপ প্রবাহে বন্যা হয়ে থাকে। এই বন্যার জলকে নদীর দুই তীরের বাঁধের সুইস গেট উন্মুক্ত করে নীচের প্লাবন ভূমিতে পাঠানো হয়। এই পদ্ধতিতে বন্যার সময় আসোয়ান থেকে মোহানা পর্যন্ত অঞ্চলের প্লাবন ভূমিতে বন্যার জলবাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে মাটিকে সমৃদ্ধ করে। তবে বন্যা না হলে এই পদ্ধতির প্রয়োগ সম্ভব নয়।

মিশরের জলসেচের ফলাফল (Effects of Irrigation)


• সুপ্রভাব: (1) মিশরের মরু ও মরুপ্রায় পরিবেশে জলসেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। নীলনদের জলকে সেচের কাজে ব্যবহার করে ধান, গম, ভুট্টা প্রভৃতি উৎপাদন করা হচ্ছে। (2) কৃষিকাজের বিকাশ ঘটায় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। (3) কৃষিক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করে কার্পাস বয়ন, তামাক, চিনি প্রভৃতি কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। (4) জলসেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রের সম্প্রসারণ ঘটছে। (5) দেশের অর্থনৈতিক সুদৃঢ়করণ সম্ভব হয়েছে।

• কুপ্রভাব:(i) অতিরিক্ত পরিমাণে নীলনদের জল ব্যবহারের ফলে নদীতে জলের ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে এবং সমুদ্রের নোনা জলের অনুপ্রবেশের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। (ii) সমুদ্রের লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশের ফলে স্বাদু জলের বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে।  (iii) 
মিশরের বহু অঞ্চলে অতিরিক্ত মাত্রায় ভৌমজল উত্তোলনের মাধ্যমে জলসেচ করার ফলে লবণাক্ততার সমস্যা লক্ষ করা যাচ্ছে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ