মুক্ত বা নালা পদ্ধতি/বৃহৎ মাত্রার জলসেচ পদ্ধতি

মুক্ত বা নালা পদ্ধতি/বৃহৎ মাত্রার জলসেচ পদ্ধতি (Open Conduit Method/Large Scale Irrigation System)


• সংজ্ঞা: যখন এক ধরনের ফসল উৎপাদনের জন্য কোনো বিশাল আয়তনের জমিতে আল বা নালার মাধ্যমে কোনো জলাশয় বা কোনো নদীর জল সরবরাহ করা হয়, তখন তাকে মুক্ত বা নালা পদ্ধতি বা বৃহৎ মাত্রার সেচ পদ্ধতি বলা হয়। 


শ্রেণিবিভাগ: বৃহৎ মাত্রার সেচ ব্যবস্থা দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত-1 . পৃষ্ঠীয় জলসেচ ব্যবস্থা (Surface Irriga-

tion Stystem) ও 2 .উপপৃষ্ঠীয় জলসেচ ব্যবস্থা (Subsurface Irrigation System) | • পৃষ্ঠীয় ও উপপৃষ্ঠীয় জলসেচ ব্যবস্থার ধারণা: বিভিন্ন জলাশয় থেকে পাম্প দিয়ে জল তুলে, সেচ খালের জল জমির উপর দিয়ে চালনা করে অথবা নলকূপ বা কূপের সাহায্যে (ভৌমজল কৃষিজমির উপর প্রবাহিত করাকে পৃষ্ঠীয় ও উপপৃষ্ঠীয় জলসেচ ব্যবস্থা বলা হয়।


মুক্ত বা নালা পদ্ধতি/বৃহৎ মাত্রার জলসেচ পদ্ধতির বিভিন্ন কৌশল:


খাল জলসেচ পদ্ধতি (Canal Irrigation Method): 


সংজ্ঞা: স্বল্প ভূমিঢাল সম্পন্ন কৃষি জমির কাছে বিভিন্ন

জলাশয়, যেমন-নদী, হ্রদ প্রভৃতি থাকলে সেখানকার জল খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হয়। এই জলসেচ পদ্ধতিকে খাল জলসেচ পদ্ধতি বলা হয়।


• শ্রেণিবিভাগ: খাল জলসেচ পদ্ধতিতে জলের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে দুই ধরনের খালের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।


প্লাবন খাল (Inundation Canal): নদী থেকে একটি সুনিদিষ্ট উচ্চতায় খাল খনন করে বর্ষার অতিরিক্ত জলকে ওই খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হলে তাকে প্লাবন খাল বলে। ভারতের দক্ষিণাংশে এই খাল লক্ষ করা যায়। সাধারণত শুষ্ক ঋতুতে বা বৃষ্টির পরিমাণ কম থাকলে এই খালে জল থাকে না। প্রধানত বর্ষার জোয়ারের ফলে বা বর্ষার সময় বন্যা হলে প্লাবন খালে জল থাকে। 


নিত্যবহ বা স্থায়ী খাল (Perennial Canal): নিত্যবহ নদী বা পার্বত্য অঞ্চলে নদীর ওপরে আড়াআড়ি ভাবে বাঁধ নির্মাণ করে সৃষ্ট জলাধার থেকে যে খাল খনন করা হয়, তাকে নিত্যবহ বা স্থায়ী খাল বলে। ভারতে বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা কার্যকরী হওয়ার ফলে নিত্যবহ বা স্থায়ী খালের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরনের খালে সারাবছর জল থাকে।


খাল জলসেচ পদ্ধতির গুরুত্ব: (i) পতিত জমিকে খাল জলসেচের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পরিণত করা সম্ভব হয়। যেমন-রাজস্থানের এক বিশালায়তন অব্যবহৃত জমিতে ইন্দিরা গান্ধি ক্যানেল-এর মাধ্যমে শস্য উৎপাদন করা হচ্ছে। (ii) এই পদ্ধতির সাহায্যে এক বিশাল আয়তন বিশিষ্ট জমিতে জলসেচ করা সম্ভব। (iii) খালের জল থেকে কিছু পরিমাণ জল ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, যার ফলে ভৌমজলের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ হয়। (iv) খালের জলে নদীর পলি এসে জমা হয় এবং এই পলি চাষের জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। (v) সারাবছরব্যাপী সেচের জল পাওয়া যায় বলে এই পদ্ধতির সাহায্যে খরার সময়েও ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। (vi) খাল খনন করার প্রাথমিক ব্যয় যথেষ্ট বেশি হলেও সারাবছর বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। (vii) জলসেচ পদ্ধতির সাহায্যে বহুমুখী নদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।


সমস্যা: (১) শুষ্ক সময়ে জলাধার, নদী প্রভৃতিতে জলের পরিমাণ কমে গেলে জলসেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। (ii) বর্ষাকালে জলের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতে বন্যা হয়ে থাকে। (iii) ভূ-অভ্যন্তরের নোনা জল খালের জলের সঙ্গে মিশ্রিত হলে মাটি লবণাক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা যায়। ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রে এই সমস্যা লক্ষ করা যায়। (iv) খাল তৈরির প্রাথমিক ব্যয় যথেষ্ট বেশি এবং এর ফলে প্রচুর জমি নষ্ট হয়ে থাকে। (v) পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চলে খাল সেচ পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। (vi) খাল সংলগ্ন জলমগ্ন স্থানে মশা সহজেই বংশবৃদ্ধি করে এবং ম্যালেরিয়াজনিত সমস্যা লক্ষ করা যায়।


খাত রেখা জলসেচ পদ্ধতি (Furrow Irrigation Method): সংজ্ঞা: এই পদ্ধতিতে প্রশস্ত প্রধান নালা খনন করা হয় এবং ওই খালের দুইপাশে বা একপাশে সমান ঢালযুক্ত যে চাষযোগ্য জমি থাকে সেখানে প্রধান নালা থেকে সৃষ্ট অসংখ্য ছোটো নালা দ্বারা জলের জোগান দেওয়া সম্ভব হয়।


• শ্রেণিবিভাগ: খাত রেখা জলসেচ পদ্ধতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকারভেদ লক্ষ করা যায় যথা- (a) সমান্তরাল সরল সমতল খাত সেচ (Straight Level Furrow): সমতল ও ক্ষুদ্র জমিতে লক্ষ করা যায়। (b) সরল উতরাই খাত সেচ (Straight Graded Furrow): ঢালযুক্ত ও বিশালায়তন জমিতে মৃত্তিকার ক্ষয় প্রতিরোধের জন্য এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। (c) উচ্চস্তরীয় খাত সেচ (Raised Bed Furrow): দুটি খাতের মধ্যবর্তী জমিকে প্রশস্ত ও উঁচু করে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। (d) পর্যায়ক্রমিক খাত সেচ (Alternate Furrow): শুষ্ক ও লবণাক্ত মৃত্তিকাযুক্ত অঞ্চলের খাতগুলিকে পরপর কিছুদিন জলপূর্ণ করে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। (e) তরঙ্গায়িত খাত সেচ (Corragation Furrow): যেসব অঞ্চলে কাঁকরযুক্ত মাটি লক্ষ করা যায়, সেখানে পরস্পর সংলগ্ন ভাবে দানাশস্য চাষের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়। 


বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: (a) নালার ঢাল (Slope of Conduit): জলের গতিবেগ ও মৃত্তিকার প্রবণতার দ্বারা প্রধান নালার অনুদৈর্ঘ্য ঢালের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। (b) নালার গঠন (Structure of Conduit): বেশি ঢালযুক্ত জমিতে নালাগুলি সাধারণত তির্যকভাবে অবস্থান করে। নালার গঠন মূলত নির্ভর করে শস্যের প্রকৃতি ও ভূমির ঢালের ওপরে। (c) অনুপ্রবেশের মাত্রা (Level of Infiltration): মৃত্তিকার গঠন ও প্রকৃতির ওপর জলের অনুপ্রবেশের মাত্রা নির্ভর করে। যেমন-এঁটেল মাটিতে জলের অনুপ্রবেশের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম হয়ে থাকে। (d) নালার বিস্তার (Extension of Conduit): শ্রমিকদের সেচ পদ্ধতি সংক্রান্ত ধারণা, কর্মদক্ষতা ও মৃত্তিকার প্রবেশ্যতার ওপর প্রধান নালার বিস্তার নির্ভর করে। (e) ফসলের প্রকৃতি (Nature of Crops): খাত রেখা জলসেচ পদ্ধতির মাধ্যমে সাধারণত আখ, কার্পাস ইত্যাদি


এমন কিছু ফসল চাষ করা হয়, যাদের জলের চাহিদা কম। আলু, ভুট্টা প্রভৃতি ফসল এই পদ্ধতির সাহায্যে উৎপাদন করা হয়। • অববাহিকা বা বেসিন বা চেক জলসেচ পদ্ধতি (Basin or Check Irrigation Method): সংজ্ঞা: যে


পদ্ধতিতে ক্ষুদ্রায়তন জমির চারদিকে উঁচু বাঁধ দিয়ে ঘিরে ফেলে তার ভিতরে জলসেচ করা হয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মৃত্তিকার ভিতরে জলের অনুপ্রবেশ না ঘটছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই অববাহিকার ভিতরেই জলকে আবন্ধ করে রাখা হয়, সেই পদ্ধতিকে অববাহিকা বা বেসিন বা চেক জলসেচ পদ্ধতি বলে।


• শ্রেণিবিভাগ: অববাহিকা বা বেসিন জলসেচ পদ্ধতিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়- (a) সমোন্নতি বেসিন জলসেচ পদ্ধতি (Contour Basin Irrigation Method): এক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলের ঢালু ভূমিভাগে সমোন্নতি রেখা অনুযায়ী লম্বা আকারের অববাহিকা তৈরি করা হয়। (b) বর্গাকার বেসিন জলসেচ পদ্ধতি (Square Basin Irrigation Method): এক্ষেত্রে সমতল কৃষিজমিকে আয়তক্ষেত্র বা বর্গক্ষেত্রের আকারে বিভক্ত করা হয়।


• বিশেষ বৈশিষ্ট্য: (1) অববাহিকা জলসেচ পদ্ধতির সাহায্যে প্রধানত ফল উৎপাদন করা হয়। (ii) জলপ্রবাহকারী খালের গভীরতা ও নদীর বিন্যাসের ওপর এই পদ্ধতি অনেকাংশে নির্ভর করে। (ii) তা ছাড়া, অববাহিকার আকৃতি ও মৃত্তিকার ধর্মও অববাহিকা বা চেক জলসেচ পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।


• সমস্যা: (i) এক্ষেত্রে মৃত্তিকা অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির হওয়ায় প্রায়ই কর্ষণের প্রয়োজন পড়ে। (ii) এই পদ্ধতি সব ধরনের ফসল উৎপাদনে সহায়ক নয়, কারণ এক্ষেত্রে গাছের গোড়ায় জল জমা হয়ে থাকে।


• কিনারা জলসেচ পদ্ধতি (Border Irrigation Method): সংজ্ঞা: যে পদ্ধতিতে আল দ্বারা সেচের জলকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং দুটি আলের মাঝখানের সমতল জমিতে জলের জোগান দেওয়া হয়, তাকে কিনারা জলসেচ পদ্ধতি বলে। 


শ্রেণিবিভাগ: কিনারা জলসেচ পদ্ধতিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়- (a) সমোন্নতি রেখা সীমানা ফালি সেচ (Con- tour Border Strip Irrigation): পাহাড়ি ও মালভূমি অঞ্চলের ভূমিক্ষয় রোধের জন্য কৃষিজমিতে সমোন্নতি রেখা অনুসরণ করে ফালি তৈরি করে জলসেচের ব্যবস্থা করা হয়। এই জলসেচের সাহায্যে ডাল, ভুট্টা, তামাকের চাষ করা হয়। (৮) সরল সীমানা ফালি সেচ (Straight Border Strip Irrigation): মৃদু ঢালু বা প্রায় সমতল কৃষিজমিকে লম্বা ফালিতে ভাগ করা হয় এবং দুটি ফালির মাঝখানের অংশে জলসেচ করা হয়। এই পদ্ধতির সাহায্যে ওট, বিট, গম প্রভৃতি উৎপাদন করা হয়। 


সমস্যা: (i) এই পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত ঢালু, সুদীর্ঘ ও আয়তাকার জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়। (ii) কিনারাতে জল নিষ্কাশন না করা হলে ভূমিক্ষয় ঘটে থাকে। নিউজিল্যান্ডে এই সেচ ব্যবস্থা যথেষ্ট প্রচলিত।


• প্লাবন জলসেচ পদ্ধতি (Flood Irrigation Method): সংজ্ঞা: এই জলসেচ পদ্ধতিতে জমির উপর যাতে জল দাঁড়িয়ে থাকে তার জন্য বিশালায়তন জমিতে খাল বা নদী, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয় থেকে জল তুলে অথবা ভৌমজল তুলে জমিটিকে পূর্ণ করা হয়। ধান জাতীয় যেসব ফসল চাষের ক্ষেত্রে জমিতে জল দাঁড়িয়ে থাকা প্রয়োজন সেক্ষেত্রে প্লাবন জলসেচ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।


• বেসিন ও বলয় জলসেচ পদ্ধতি (Basin and Zone Irrigation Method): সংজ্ঞা: হটিকালচার বা ফুল, সবজি, ফল প্রভৃতি উৎপাদনের জন্য গাছের গোড়ায় বর্গাকৃতি বা গোলাকৃতির বেসিন বা বলয় তৈরি করা হয় এবং প্রধান খাল সংলগ্ন শাখা খাল থেকে জল সরবরাহ করা হয়। • স্থির-সমতলীয় জলসেচ পদ্ধতি (Dead Level Irrigation Method): 


সংজ্ঞা: এই জলসেচ পদ্ধতিতে কৃষিজমির সব জায়গায় জল সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য জমিকে সমতল করে জমিতে আল দিয়ে আবন্ধ করা হয়, যাতে সেচের জল একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। প্রধানত ধান চাষের ক্ষেত্রে এই জলসেচ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন