নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদের মূল বক্তব্য কী তা উল্লেখ করো।

নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদের মূল বক্তব্য


নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ অনুযায়ী ইন্দ্রিয় সংবেদন জ্ঞানের একটি মুখ্য ও নির্ভরযোগ্য উৎসরূপে গণ্য হলেও অপরাপর উৎসের মাধ্যমেও জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। অর্থাৎ, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার মাধ্যমেও জ্ঞানলাভ হতে পারে। নরমপন্থী বুদ্ধিবাদীরা জ্ঞানের উৎস সম্বন্ধীয় আলোচনায় অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধির ভূমিকাকেও স্বীকার করে নিয়েছেন। নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদীরূপে শীর্ষস্থান অধিকার করে আছেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম।

দু-প্রকার জ্ঞানের স্বীকৃতি: 


নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক ডেভিড হিউম দু-প্রকার জ্ঞানকে স্বীকার করেছেন। এই দু-প্রকার জ্ঞানের একটি হল অভিজ্ঞতানির্ভর তথ্যমূলক জ্ঞান (knowledge about matters of fact) এবং অপরটি হল বুদ্ধিনির্ভর ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান (knowledge about relation of ideas)। 
[1] অভিজ্ঞতানির্ভর তথ্যমূলক জ্ঞান: 
এই প্রকারের জ্ঞান লাভ করা যায় মূলত ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। তাই এধরনের
জ্ঞানগুলি কখনোই সুনিশ্চিতরূপে গণ্য নয়। এগুলি সত্যও হতে পারে, আবার মিথ্যাও হতে পারে। অর্থাৎ এগুলি আপতিকরূপেই গণ্য। 'সূর্য উদিত হয়েছে'-এটি হল একটি অভিজ্ঞতানির্ভর তথ্যমূলক জ্ঞান। আমাদের অভিজ্ঞতাই এর সত্যতা নির্ণয় করতে পারে। বিশুদ্ধ বুদ্ধির দ্বারা এর সত্যতা নির্ণয় করা যায় না। এই ধরনের জ্ঞান তাই পরতঃসাধ্য ও অবশ্যই সংশ্লেষক। এরূপ জ্ঞান তাই সুনিশ্চিত নয়।

[ 2] ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান

এই ধরনের জ্ঞান লাভ করা যায় মূলত বোধশক্তি তথা বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে, কখনোই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নয়। এই প্রকারের জ্ঞান অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষরূপে গণ্য হওয়ায় তা অনিবার্যভাবে সত্য। এই ধরনের জ্ঞানের বিরোধী বচনগুলি সবসময়ই মিথ্যারূপে গণ্য। গণিতশাস্ত্র ও যুক্তিবিজ্ঞানের জ্ঞান মূলত এই ধরনের জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং, ডেভিড হিউম একজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকরূপে গণ্য হলেও, তিনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বুদ্ধির বিষয়টিকে উপেক্ষা করেননি।

সংশয়বাদের প্রতিষ্ঠা: 


নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদের আরও একদফা পরিচয় পাওয়া যায় হিউমের সংশয়বাদের মাধ্যমে। জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে সংশয়বাদের আবির্ভাব হয় হিউমের দর্শনে। এ কথা বলা যায় যে, হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের স্বাভাবিক পরিণতি হল সংশয়বাদ। কারণ, কয়েকটি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা একটি সার্বিক বচন প্রতিষ্ঠা করি। এরূপ সার্বিক বচনটি কিন্তু কখনোই অনিবার্যভাবে সত্য হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ বিশেষ বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্রে আগুনের দাহিকা শক্তিকে প্রত্যক্ষ করে আমরা সার্বিকভাবে বলি যে, সমস্ত ক্ষেত্রেই আগুন দহনক্রিয়া সম্পন্ন করে। এরূপ সার্বিক বচনকে কখনোই সুনিশ্চিতরূপে গণ্য করা যায় না। তাই এ ধরনের বচন সংশয়াত্মক। কিন্তু হিউম গাণিতিক বচনের ক্ষেত্রে সংশয়াত্মক মনোভাব পোষণ করেননি, যদিও তা বুদ্ধির দ্বারা লভ্য। সুতরাং দেখা যায়, জ্ঞানলাভের উপায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে হিউম অভিজ্ঞতাবাদী হয়েও বুদ্ধিবাদের ক্ষেত্রে নরম মনোভাব গ্রহণ করেছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ