পারমাণবিক শক্তি

পারমাণবিক শক্তির ধারণা: 


অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পরমাণুর বিভাজন ঘটিয়ে যে শক্তি উৎপাদন করা হয়, তাকে বলে পারমাণবিক শক্তি। পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান কাঁচামালগুলি হল-ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, লিথিয়াম, প্লুটোনিয়াম, ভারী জল, হাইড্রোজেন প্রভৃতি। পৃথিবীতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপাদিত হয়।

পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া: 


পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান দুটি প্রক্রিয়া হল-ফিসন (Fission) এবং ফিউসন (Fusion)। ফিসন হল এমন একটি বিভাজন পদ্ধতি যার মাধ্যমে একটি নিউক্লিয়াসের বিভাজন ঘটে অসংখ্য নিউক্লিয়াস গঠিত হয় এবং এই সময় নির্গত তাপ থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তাই হল পারমাণবিক বিদ্যুৎ। অন্যদিকে ফিউসন হল এমন একটি সংযোজন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে পরমাণুর দুটি নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে একটি নিউক্লিয়াস গঠন করে। এর ফলে যে বিশাল পরিমাণ তাপ উৎপাদিত তার সাহায্যে শুধুমাত্র হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করা ছাড়া আর কোনো উৎপাদনমূলক কাজ করা সম্ভব নয়।

পারমাণবিক শক্তি-প্রধান উৎপাদনকারী দেশসমূহ: 


2017 খ্রিস্টাব্দে International Atomic Energy- এর পরিসংখ্যান অনুসারে পৃথিবীর 30টি দেশে প্রায় 449টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কার্যকরী রয়েছে এবং 15টি দেশে প্রায় 60টি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গঠন করা হচ্ছে। 1956 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের ক্যালডার। হল-এ পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

পারমাণবিক শক্তি-ভারত: 2016 খ্রিস্টাব্দে ভারতে মোট উৎপাদিত বিদ্যুৎ-এর মধ্যে 35000 গিগাওয়াট/ঘণ্টা (Gwh) হল পারমাণবিক বিদ্যুৎ। বর্তমানে ৪টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে 22টি রি-অ্যাক্টর কার্যকরী আছে, যেগুলির মোট উৎপাদন ক্ষমতা 6780 মেগাওয়াট (MW)। ভারত পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে পৃথিবীতে একাদশ স্থানের অধিকারী (2015 খ্রিস্টাব্দ)। ভারতের প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি হল-(1) মহারাষ্ট্রের তারাপুর (1400 MW), (ii) রাজস্থানের রাওয়াতভাটা (1180 MW), (iii) তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম (2000 MW), (iv) কর্ণাটকের কৈগা (880) MW), (v) গুজরাটের কাকরাপাড় (440 MW), (vi) তামিলনাড়ুর কালপক্কম (440 MW), (vii) উত্তরপ্রদেশের নারোরা (440 MW)। এ ছাড়া উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর, গুজরাটের কাকরাপাড় ইউনিট-3 ও 4, রাজস্থানের রাজস্থান ইউনিট-7 ও ৪, তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম; অন্ধ্রপ্রদেশের পুলিভেন্দুলা; মহারাষ্ট্রের জইতাপুর প্রভৃতি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি গঠনের কাজ চলছে।

পারমাণবিক বিদ্যুতের সুবিধা: 


(i) পরিবহণ ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তির গুরুত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ভাণ্ডার নিঃশেষের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তির উৎস হল পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তি। (ii) 12000 মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যেখানে 6000 টন কয়লার প্রয়োজন হয়, সেখানে মাত্র 1 পাউন্ড ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম থেকে এই একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। অর্থাৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কাঁচামালের ব্যবহার যথেষ্ট কম মাত্রায় করা হয়। (iii) সমুদ্রের জলকে লবণমুক্ত করার জন্যও এই বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহৃত হয়। (iv) পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গঠনের ক্ষেত্রে আবর্তক ব্যয় (Recurring Expenditure) যথেষ্ট কম হওয়ায় অত্যন্ত সুলভে এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হয়। (v) পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি কৃত্রিম উপগ্রহে শক্তির জোগান দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়।

পারমাণবিক শক্তির সমস্যা: (i) পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রধান কাঁচামাল, যেমন-ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম প্রভৃতি সর্বত্র পাওয়া যায় না। (ii) শক্তি উৎপাদনের সময় দুর্ঘটনা বা অন্যান্য কারণে নির্গত তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারিপার্শ্বিক অঞ্চলের মানুষসহ বিভিন্ন জীবের স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার করে। (iii) পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় বর্জ্যগুলি সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশকে ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। (iv) পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ব্রিডার রি-অ্যাক্টর যথেষ্ট ব্যয়বহুল হওয়ায় অনুন্নত দেশগুলি এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবসময় সক্ষম হয় না। (v) পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে পরমাণু বোমা তৈরি করা যেতে পারে। যুদ্ধের সময় এই বোমার ব্যবহার কোনো অঞ্চলকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে। (vi) পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের উপযোগী প্রযুক্তি পৃথিবীর সব দেশের পক্ষে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ