যুক্তির বৈধতা ও যুক্তির অবৈধতা

যুক্তির বৈধতা (Validity of Arguments)


আমরা জানি যে, অনুমানকে যখন ভাষায় ব্যক্ত করা হয়, তখন তাকে বলা হয় যুক্তি। এই যুক্তি ঠিক বা শুদ্ধ হতে পারে, আবার তা অশুদ্ধ বা ভুলও হতে পারে। তর্কবিদ্যায় নির্ভুল বা শুদ্ধ যুক্তিকে বলা হয় বৈধ যুক্তি (Valid Argument), আর ভুল বা অশুদ্ধ যুক্তিকে বলা হয় অবৈধ যুক্তি (Invalid Argument)। বৈধতা তথা বৈধ বা অবৈধ শব্দ দুটি তাই শুধুমাত্র অবরোহ যুক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যুক্তি বা যুক্তির আকার, যাই বলা হোক না কেন, এই দুটি বিষয়ের সঙ্গেই বৈধতার প্রশ্নটি জড়িত। তাই বৈধতাকে অবরোহ যুক্তির নিজস্ব ধর্ম বা বৈশিষ্ট্যরূপে উল্লেখ করা হয়। একটি যুক্তি বৈধ হতে পারে, আবার অবৈধও হতে পারে। তাই সমস্ত যুক্তিই বৈধ-রূপে গণ্য হতে পারে না, আবার সমস্ত যুক্তিই অবৈধ-রূপেও গণ্য হতে পারে না। এজন্য কোনো কোনো যুক্তি বৈধরূপে গণ্য, আবার কোনো কোনো যুক্তি অবৈধরূপে স্বীকৃত।


1) যুক্তির আকারের সঙ্গে যুক্তির বৈধতার সম্পর্ক: আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, প্রত্যেকটি অবরোহ যুক্তির মধ্যে দুটি বিষয় দেখা যায়। আকার এবং উপাদান। একাধিক বচন সহযোগে একটি অবরোহ যুক্তি গঠিত হয়। এই বচনগুলি হল অবরোহ যুক্তির উপাদান এবং এগুলি পরিবর্তনীয়। কিন্তু যুক্তির আকারগুলি হল অপরিবর্তনীয়। যুক্তির বৈধতার বিষয়টি তাই তার অপরিবর্তনীয় সত্তা, অর্থাৎ তার আকারের সঙ্গে যুক্ত।


2) যুক্তির বৈধতার ভিত্তি হিসেবে যুক্তির আকার: সঠিক নিয়মে একটি অবরোহ যুক্তি গঠিত হলে, অর্থাৎ তার আকারটি সঠিকভাবে গঠিত হলে যুক্তিটি বৈধ (Valid)-ৰূপে গণ্য হয়, অন্যথায় যুক্তিটি অবৈধ (Invalid)-রূপে গণ্য হয়। যুক্তির নিয়মগুলি তার আকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যভাবে বললে, অবরোহ যুক্তির বৈধতা আসলে তার আকারেরই ধর্ম। একটি যুক্তিকে তখনই বৈধ বলা যাবে, যখনই দেখা যাবে যে, তার আকারটি বৈধ। যদি এমন হয় যে, কোনো একটি যুক্তির আকারটি শুধু বলা আছে কিন্তু যুক্তিটি জানা নেই, সেক্ষেত্রে যুক্তির আকারটি থেকে শত-সহস্র যুক্তি মূর্ত বা বাস্তবায়িত হতে পারে। যুক্তির আকারটি বৈধ হলে, ওই সমস্ত যুক্তিই বৈধ হয়, আর যুক্তির আকারটি অবৈধ হলে ওই সমস্ত যুক্তির সবকটিই অবৈধ হয়। এজন্য, যুক্তির বৈধতা বিচার করতে গেলে প্রথমে যুক্তি থেকে যুক্তির আকারটিকে আলাদা করতে হয় এবং বিচার করে দেখতে হয় যুক্তির আকারটি বৈধ কিনা।


3) যুক্তি ও যুক্তির আকারের বৈধতা নিরূপণ: যুক্তির আকারের বৈধতা নিরূপণের বিভিন্ন নিয়ম আছে। এই নিয়মগুলিকে বিভাগ 'ক'-এর 5 এবং ৪ নং অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টিকে স্পষ্ট করা হল -  


উদাহরণ- 

যুক্তি

সকল প্রাণময় সত্তা হয় অনুভূতিসম্পন্ন। সকল বৃক্ষ হয় প্রাণময় সত্তা।

= সকল বৃক্ষ হয় অনুভূতিসম্পন্ন।

বৈধতা

এই যুক্তিটি বৈধ, কারণ এর আকারটি বৈধ।


যুক্তির আকার

সকল M হয় P সকল S হয় M

.: সকল S হয় P 


যুক্তির অবৈধতা (Invalidity of Arguments)


অবরোহ তর্কবিজ্ঞানে একটি যুক্তি যেমন বৈধ (Valid) হতে পারে, তেমনি তা অবৈধ (Invalid)-রূপেও গণ্য হতে পারে। বৈধ যুক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, সিদ্ধান্তটি অনিবার্যভাবে যুক্তিবাক্য থেকে নিঃসৃত হয়। অর্থাৎ, যুক্তিবাক্য বা বাক্যগুলি যদি সত্য হয় তবে, সিদ্ধান্তটি কখনোই মিথ্যা হতে পারে না। কিন্তু যুক্তিটি যদি অবৈধ হয়, তবে যুক্তি বা যুক্তিবাক্যগুলি সত্য (True) হওয়া সত্ত্বেও সিদ্ধান্তটি মিথ্যা (False) হতে পারে।


যেমন- সকল মহিলা হল মরণশীল। [সত্য] সকল পুরুষ হল মরণশীল। [সত্য] .:. সকল পুরুষ হল মহিলা। [মিথ্যা]


কোনো যুক্তির আকারটি যদি এমন হয় যে এর সিদ্ধান্তটি মিথ্যা অথচ সমস্ত যুক্তিবাক্যগুলিই সত্য, তাহলেই যুক্তিটিকে বলা হয় অবৈধ (Invalid)। একারণেই তর্কবিদরা বলে থাকেন, অবৈধ যুক্তির সিদ্ধান্তটি কখনোই যুক্তিবাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হতে পারে না। বৈধতার মতো অবৈধতার বিষয়টিও যুক্তির আকারের ওপরই নির্ভরশীল।

উদাহরণ- 

যুক্তি

a) সকল ছাত্রী হয় পড়ুয়া। b) সকল ছাত্র হয় পড়ুয়া। .. c) সকল ছাত্র হয় ছাত্রী।


A[সত্য] b[সত্য] c[মিথ্যা]



Comments

Popular posts from this blog

ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের অবদান আলোচনা করো।

মাত্র এক ক্লিকেই ছবি থেকে ইমোজি কিভাবে রিমুভ করবেন ?

পদ কাকে বলে? পদ কত প্রকার ও কী কী?