ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি.) বৃহত্তর প্রভাব কী ছিল?

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্সে প্রচলিত পুরাতনতন্ত্র ধ্বংস করে আধুনিক চিন্তা-চেতনাসম্পন্ন এক নতুন যুগের সূচনা করে। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন মনে করেন যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ফরাসি বিপ্লবই আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল

ফ্রান্স তথা ইউরোপের ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লবের গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। যথা-

[1] সামন্ততন্ত্রের অবসান: বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটে। যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের বিশেষ অধিকার, সামাজিক বৈষম্য প্রভৃতি বিলুপ্ত হয়। সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক কর বাতিল করা হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের চোখে সাম্য, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

[ 2] প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে (২৬ আগস্ট)
'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকার' ঘোষণার দ্বারা রাজতন্ত্রের বহু অধিকার খর্ব করা হয়, ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।

[ 3] গির্জার আধিপত্য ধ্বংস: ফরাসি বিপ্লবের ফলে
দুর্নীতিগ্রস্ত গির্জাব্যবস্থা ও যাজকতন্ত্রের ক্ষমতার অবসান ঘটে। গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়, জনগণ কর্তৃক যাজকদের নির্বাচন ও সরকার কর্তৃক তাদের বেতন দানের ব্যবস্থা করা হয়। 

[4] জনগণের অধিকার: বিপ্লবের ফলে স্বৈরাচারী
রাজতন্ত্রের পরিবর্তে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ফরাসি জাতীয় সভা 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকার' ঘোষণার (১৭৮৯ খ্রি.) দ্বারা জনগণের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার প্রভৃতি স্বীকৃত হয়। 

[5] সুশাসন প্রতিষ্ঠা: ফরাসি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ফ্রান্সের সর্বত্র একই ধরনের আইনকানুন ও মুদ্রাব্যবস্থা চালু করা হয়। প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে জন্মকৌলিন্যের পরিবর্তে যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

[6] জাতীয়তাবাদের প্রসার: রাজতন্ত্রের পরিবর্তে দেশ ও জাতির প্রতি ফরাসিদের আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলে। এভাবে ফরাসি জাতির দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ বিকশিত হয়। বিদেশি শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে।

[7 ] সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শ: ফরাসি বিপ্লবের দ্বারা ফ্রান্সে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শ জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিপ্লব ফরাসি যাজক ও অভিজাতদের 'বিশেষ অধিকার', সামাজিক বৈষম্য প্রভৃতি বাতিল করে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। মানুষে মানুষে কোনো প্রভেদ নেই, একই আদর্শে অনুপ্রাণিত সব মানুষ মৈত্রী বা ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধনে আবদ্ধ-ফরাসি বিপ্লব এই আদর্শ প্রচার করে। বিপ্লব বিশ্ববাসীর সামনে ঘোষণা করে যে, "স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার।"

[৪ ] পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ: প্রথমদিকে মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে ফরাসি বিপ্লব তীব্র হয়ে ওঠে। পরে বুর্জোয়া শ্রেণিই বিপ্লবের যাবতীয় সুফল ভোগ করে। সংবিধান সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বুর্জোয়া সদস্যদের উদ্যোগে দেশে বুর্জোয়া পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিকশিত হয়। 

[9] শিক্ষা ও সংস্কৃতির অগ্রগতি: ফরাসি বিপ্লব শিক্ষাব্যবস্থাকে গির্জার নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনে। জ্যাকোবিনরা প্রধানত প্রাথমিক শিক্ষার ওপর এবং থার্মিডোরীয়রা উচ্চশিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে ফ্রান্সে শিক্ষার অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা নেয়। সাহিত্য, বিজ্ঞান প্রভৃতি শিক্ষার প্রসারেও উদ্যোগ নেওয়া হয়।

[10] সাম্যবাদের আদর্শ: ঐতিহাসিক ক্রপোটকিন মনে করেন যে, আধুনিককালের সাম্যবাদ ও সমাজতান্ত্রিক ধারণার উৎস হল ফরাসি বিপ্লব। বেবিউফ বিপ্লবের সময়ে ফ্রান্সে এরূপ ধারণার প্রচার করেন।

মূল্যায়ন: ফ্রান্সের বাইরে ইউরোপ তথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফরাসি বিপ্লবের গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। নেপোলিয়ন ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের 'আধুনিক ভাবধারার তরবারি'। তিনি সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের ভাবধারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেন। এর ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পুরাতনতন্ত্র ধ্বংস হয়ে সামাজিক সাম্য, আইনের চোখে সাম্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ