কয়লা

কয়লার বৈশিষ্ট্য: 


কয়লা একটি ওজন হ্রাসশীল, গচ্ছিত, ক্ষয়িয়, অপুনর্ভব সম্পদ। কয়লা এমন এক জীবাশ্ম জ্বালানি, যা অতীতে ও বর্তমানে পৃথিবীর বহু স্থানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও পরিবহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কয়লার গুরুত্বের প্রেক্ষিতে একে কালো হিরে (Black Diamond) বলে।


কয়লা উপাদান: 


কয়লার অন্যতম উপাদান হল কার্বন। উৎকৃষ্ট মানের কয়লায় কার্বনের পরিমাণ থাকে সব থেকে বেশি (প্রায় 95%), যেমন-কার্বনিফেরাস যুগের কয়লা। অন্যদিকে নিকৃষ্ট প্রকৃতির কয়লায় কার্বনের পরিমাণ থাকে প্রায় 30% যেমন-টার্সিয়ারি যুগের কয়লা। কার্বন ছাড়া কয়লার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলি হল সালফার, উদ্বায়ী পদার্থ, জলীয় বাষ্প, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ এবং কিছু অদাহ্য পদার্থ। 


কয়লার উৎপত্তি: 

পৃথিবীর বেশিরভাগ কয়লা কার্বনিফেরাস যুগের বনভূমি ভূগর্ভে চাপা পড়ে ভূ-অভ্যন্তরস্থ চাপ ও তাপের প্রভাবে উৎপন্ন হয়েছে। প্রধানত পাললিক বা স্তরীভূত শিলায় চাপা পড়ে যাওয়া উদ্ভিদ মধ্যস্থ কার্বন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কয়লায় রূপান্তরিত হয়। কয়লা এক প্রকার স্তরীভূত জৈব শিলা


কোক কয়লা (Coke Coal): 

বিটুমিনাস কয়লাকে অত্যধিক উন্নতায় গলিয়ে অঙ্গারীকরণ পদ্ধতির সাহায্যে যে উৎকৃষ্ট গুণমানবিশিষ্ট কয়লা উৎপাদন করা হয়, তাকে কোক কয়লা বলে।


গ্রাফাইট (Graphite): কয়লা থেকে তাপ ও চাপের ফলে গাঢ় কালো বর্ণের খনিজ তৈরি হয়, তাকে গ্রাফাইট বলে। পেনসিল তৈরির ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়। (Stratified Organic Rock)।


প্রকারভেদ: কার্বনের পরিমাণ অনুসারে কয়লাকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে- অ্যানথ্রাসাইট (Anthrasite): সবথেকে উৎকৃষ্ট প্রকৃতির এই কয়লায় কার্বনের পরিমাণ থাকে 85%-95%। বিশ্বে মোট উৎপাদনের প্রায় 6% হল এই প্রকার কয়লা; যা শক্ত, উজ্জ্বল কালো ও ধোঁয়া উৎপাদন করে না। ঘরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য এই কয়লা ব্যবহার করা হয়। বিটুমিনাস (Bituminous): সমগ্র পৃথিবীতে প্রায় ৪৫% বিটুমিনাস কয়লা উৎপাদিত হয়। এই কয়লা মাঝারি মানের, বর্ণ প্রায় অনুজ্জ্বল কালো, বিশেষ শক্ত নয় এবং প্রচুর ধোঁয়া উৎপাদনকারী। এতে কার্বনের পরিমাণ 50%-85% এবং লৌহ-ইস্পাত শিল্পে এই কয়লার ব্যবহার সর্বাধিক।


লিগনাইট (Lignite): সমগ্র বিশ্বে মোট কয়লা উৎপাদনের মাত্র 16% হল লিগনাইট কয়লা। বাষ্প উৎপাদনে ব্যবহৃত এই কয়লা ধোঁয়া উৎপাদন করে, বর্ণ বাদামি বা কালো। কার্বনের পরিমাণ 35%-50% এবং শক্ত প্রকৃতির নয়। এই কয়লা বাদামি বর্ণের হওয়ায় একে 'Brown Coal' বা 'বাদামি কয়লা' বলে। পিট (Peat): পিট দহনের ফলে যথেষ্ট মাত্রায় ধোঁয়া উৎপন্ন হয়। নবীন প্রকৃতির, নিকৃষ্ট মানের এই কয়লায় কার্বনের পরিমাণ থাকে 35%-এর কম। এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত কম।


উপজাত দ্রব্য: কয়লা থেকে কোক উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অঙ্গারীকরণ বা কার্বোনাইজেশন (Carbonisa- tion) পদ্ধতি প্রয়োগের সময় বহু উপজাত দ্রব্য উৎপাদিত হয়। অ্যারীকরণ পদ্ধতি প্রধানত দুই ধরনের, যথা-উচ্চতাপের অঙ্গারীকরণ ও নিম্নতাপের অঙ্গারীকরণ। • উচ্চতাপের অঙ্গারীকরণ: এই পদ্ধতিতে 900°-1000° সে. তাপমাত্রায় কয়লাকে দহন করার সময় প্রচুর পরিমাণে কোক সহ অন্যান্য বিভিন্ন দ্রব্য, যেমন-আলকাতরা, প্রচুর পরিমাণে কোল গ্যাস ও হালকা তেল পাওয়া যায়। আলকাতরা থেকে

উৎপন্ন হয়-ন্যাপথলিন, ফেনল, অ্যাসফাল্ট, ক্রিয়োজোট প্রভৃতি। • নিম্নতাপের অঙ্গারীকরণ: এই পদ্ধতিতে 450°-700° সে. তাপমাত্রায় কয়লাকে দহন করার সময় স্যাকারিন, আলকাতরা, বেনজল, টলুইন, পাইরিডিন, হালকা তেল প্রভৃতি পাওয়া যায়।

এ ছাড়া লিগনাইট কয়লা থেকে উদ্বায়ীভবন বা হাইড্রোজেনেশন (Hydrogenation) পদ্ধতির সাহায্যে পেট্রোল বা গ্যাসোলিন উৎপাদন করা হয়।


ব্যবহার ও গুরুত্ব: কয়লার প্রধান ব্যবহারগুলি হল- তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন: বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে বেশিরভাগ কয়লা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। লৌহ-ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল: লৌহ-ইস্পাত শিল্পে লৌহপিন্ড নিষ্কাশনের জন্য যে কোক-এর প্রয়োজন হয়, তার প্রধান উৎস হল কয়লা। পরিবহণ ক্ষেত্রে: কয়লা দহনের ফলে উৎপন্ন তাপের সাহায্যে যে বাষ্পশক্তি উৎপাদিত হয় তার সাহায্যে জাহাজ, রেল প্রভৃতি চালানো সম্ভব হয়। • শিল্পে জ্বালানিরূপে ব্যবহার: শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী সময়ে বহুদিন পর্যন্ত শিল্পে জ্বালানির অন্যতম উৎস ছিল কয়লা। • গৃহস্থালির কার্যাবলি: শীতল অঞ্চলে ঘরের উন্নতা বৃদ্ধির জন্য, ঘরে আলো জ্বালাতে প্রভৃতি বিভিন্ন কাজে কয়লা ব্যবহার করা হয়। বাড়ির জ্বালানি রূপে কয়লা থেকে উৎপন্ন কোল গ্যাস ব্যবহৃত হয়। কৃষিক্ষেত্রে কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার উৎপাদনের ক্ষেত্রে কয়লা থেকে প্রাপ্ত অ্যামোনিয়া ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক শিল্পে  ব্যবহার: কয়লার বিভিন্ন উপজাত দ্রব্য, যেমন- ন্যাপথলিন, ক্রিয়োজোট থেকে কীটনাশক, অ্যামোনিয়া থেকে রাসায়নিক সার ও বেনজল থেকে রঞ্জক দ্রব্য উৎপাদিত হয়।


পৃথিবীতে কয়লার বণ্টন (World Distribution of Coal): 2016 খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীতে মোট কয়লা  উৎপাদনের পরিমাণ 7460.4 মিলিয়ন টন। 


অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহ: কয়লা উৎপাদনে পৃথিবীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলি হল-কলম্বিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, উত্তর কোরিয়া, ইউক্রেন, ভিয়েতনাম প্রভৃতি।

ভারতে কয়লার বণ্টন: 2016 খ্রিস্টাব্দে ভারতে

উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় 692.4 মিলিয়ন টন এবং বিশ্বে কয়লা উৎপাদনে ভারতের স্থান দ্বিতীয়। ভারতে প্রধানত দুটি ভূতাত্ত্বিক যুগ-গন্ডোয়ানা ও টার্সিয়ারি যুগের কয়লা পাওয়া যায়।


গন্ডোয়ানা যুগের কয়লা: ভারতের প্রায় 98.5% কয়লা গন্ডোয়ানা যুগের। এই যুগে কয়লা প্রায় 27-30 কোটি বছরের পুরোনো।


টার্সিয়ারি যুগের কয়লা: টার্সিয়ারি যুগের কয়লা নিকৃষ্ট মানের এবং অধিকাংশই লিগনাইট প্রকৃতির কয়লা। এই যুগের কয়লা প্রায় 5.5-6.5 কোটি বছরের পুরোনো। ভারতে নিম্নলিখিত অঞ্চলগুলিতে টার্সিয়ারি যুগের কয়লা পাওয়া যায়- মেঘালয়

(স্থান নবম)-চেরাপুঞ্জি, তুরা প্রভৃতি। অসম (সস্থান দশম)-নাজিরা, মাকুম, জয়পুর প্রভৃতি। অরুণাচল প্রদেশ-নামচিক, নামফুক। তামিলনাড়ু-নেভেলি (ভারতের সর্ববৃহৎ লিগনাইট খনি)। রাজস্থান-বিকানীর-এর পালানা।


• গুজরাট-ব্রোচ, কচ্ছ। পশ্চিমবঙ্গ-তিনধারিয়া,

বাগরাকোট। জম্মু ও কাশ্মীর-লাড্ডা, কালাকোট প্রভৃতি

উন্নত প্রযুক্তির অভাবে সব স্থান থেকে কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। ② দেশের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানেই কয়লা পাওয়া যায়। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে কয়লা উৎপাদনের পরিমাণ কম। ④ ভারতে উৎকৃষ্ট মানের কয়লার পরিমাণ


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ