পাকিস্তানের জলসেচ

পাকিস্তানের জলসেচ (Irrigation of Pakistan)


পাকিস্তান পৃথিবীর অন্যতম প্রধান জলসেচ কার্যকরী দেশ রূপে পরিচিত। এই দেশে সেচের আওতাধীন অঞ্চলের আয়তন প্রায় 1,50,000 বর্গকিমি। এখানে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জলের বেশিরভাগই সিন্ধু নদ (65%) থেকে উত্তোলন করা হয়। পাকিস্তানে জলসেচের প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রায় 16 টি বাঁধ, 3 টি বড়ো জলাধার, প্রায় 56073 কিমি দীর্ঘ 44 টি প্রধান খাল ও প্রায় 5,50,000 টি নলকূপ গড়ে তোলা হয়েছে। অত্যন্ত শুষ্ক প্রকৃতির জলবায়ু অধ্যুষিত এই দেশে কৃষিকাজ প্রধানত জলসেচের উপর নির্ভর করে।

আরও পড়ুন-: মিশরের জলসেচ

পাকিস্তানে জলসেচের প্রয়োজনীয়তা (Necessity of Irrigation in Pakistan)


(i) পাকিস্তানের উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া অন্যান্য অংশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যথেষ্ট হওয়ায় এই অঞ্চলে ফসল উৎপাদনের জন্য জলসেচের প্রয়োজন হয়। (ii) পাকিস্তানের অধিকাংশ স্থান সিন্ধু নদের বয়ে আনা নরম পলিমাটি দ্বারা গঠিত, যেখানে সহজেই কূপ ও নলকূপ খনন করা সম্ভব হয়। (iii) এই দেশের বেশিরভাগ অংশে সমভূমি থাকায় জলসেচের গুরুত্ব অপরিসীম। (iv)  এখানকার নদীগুলি অনিত্যবহ প্রকৃতির হওয়ায় নদীতে বাঁধ দিয়ে বর্ষার অতিরিক্ত জলকে বাঁধের পিছনে গঠিত জলাশয়ে সঞ্চিত রাখা হয় এবং এর সাহায্যে জলসেচ করা হয়।


জলসেচের বিভিন্ন কৌশল (Different Techniques of Irrigation)


পাকিস্তানে নিম্নলিখিত বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্যে জলসেচ করা হয় খাল দ্বারা সেচ (Canal Irrigation): পাকিস্তানে খাল সেচের প্রচলন ইংরেজ আমল থেকে। এখানে প্রথম খাল খনন করা হয় 1859 খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার মাধোপুরে। ইরাবতী নদী থেকে এই খালটি খনন করা হয়েছিল। পাকিস্তানে প্রধানত পাঁচ ধরনের সেচখাল লক্ষ করা যায়। যেমন- (a) অনিত্যবহ খাল (Non-Perennial Canal): এই ধরনের খালে গ্রীষ্ম ও বর্ষা ছাড়া বছরের অন্যান্য সময় জল থাকে না। উদাহরণ: চন্দ্রভাগা ও ইরাবতী নদী থেকে খনন করে যথাক্রমে হাভেলি ও সিনাই খাল গঠন করা হয়েছে। (b) নিত্যবহ খাল 

(Perennial Canal): এই ধরনের খালে সারাবছর জল থাকায় কৃষিকাজে এই খালের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। (c) সংযোগকারী খাল (Connecting Canal): পাকিস্তানের খাল সেচ ব্যবস্থার অন্তর্গত সংযোগকারী খালগুলির মধ্যে অন্যতম হল চ্যামা-ঝিলাম, কোয়াডিরাবাদ বাল্লোকি, টেনসা-পাঞ্জাব, রাসুল-কোয়াভিরাবাদ প্রভৃতি। (d) প্লাবন খাল (Inundation Canal): বৃষ্টিপাতের ফলে নদীতে যে অতিরিক্ত জলরাশি জমা হয় তা প্লাবন খালের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। উদাহরণঃ চন্দ্রভাগা ও সিন্ধু নদ থেকে খনন করা প্রাচীন খালগুলির প্রকৃতি এই রূপ। (e) ক্যারেজ প্রথা (Carriage system): যে জলসেচ প্রথায় মাটির অভ্যন্তরে সুড়ঙ্গ তৈরি করে তার মধ্যে দিয়ে স্থির জল কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হয় তাকে ক্যারেজ প্রথা বলে। পাকিস্তানের পশ্চিমে বালুচিস্তানের উয় ও শুদ্ধ স্থানগুলিতে বাষ্পীভবনের হার বেশি হওয়ায় জল সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এই প্রথা প্রয়োগ করা হয়। 


জলসেচের ফলাফল (Effects of Irrigation)


পাকিস্তানে জলসেচের সুপ্রভাব: (i) পাকিস্তানের শুল্ক স্থানগুলিতে (যেমন-সিন্ধুপ্রদেশ সংলগ্ন অঞ্চল) ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। (ii) পাকিস্তানে জলসেচের প্রসার ঘটায় সেচসেবিত অঞ্চলগুলির প্রায় ৪৪% মানুষ কৃষিকাজে নিযুক্ত হয়। (iii)  কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন শিল্পের (যেমন-চিনি শিল্প, বস্ত্রবয়ন শিল্প প্রভৃতি) বিকাশ ঘটে। (iv) সমস্ত দেশে সামগ্রিকভাবে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। (v) জলসেচের প্রভাবে পাকিস্তানে ধান, গম, তুলো প্রভৃতি চাষ হয়।


পাকিস্তানে জলসেচের  কুপ্রভাব:

(I) পাকিস্তানে সিন্ধু নদের মোহানায় স্বাদু জলের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের নোনা জলের অনুপ্রবেশের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং লবণাক্ততাজনিত সমস্যা কৃষিক্ষেত্রে লক্ষ করা যাচ্ছে। (ii) সাম্প্রতিককালের উপগ্রহ চিত্র থেকে পাকিস্তানের উপকূলের পশ্চাদপসারণের ঘটনাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। (iii) অতিরিক্ত মাত্রায় ভৌমজল তোলার কারণে ভৌমজলস্তরের অবনমন ঘটছে। (iv) সিন্ধুনদের উপরে বাঁধ তৈরির ফলে সক্রিয় বদ্বীপ অঞ্চলের আয়তন যথেষ্ট মাত্রায় হ্রাস পাচ্ছে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ