বিবেকানন্দের মতে মুক্তি কী?

 বিবেকানন্দের মতে মুক্তি

নব্য বেদান্তিক দার্শনিকরূপে বিবেকানন্দ মুক্তির বিষয়টিকে স্বীকার করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের মতে মুক্তি কী তা প্রদত্ত আলোচনার মাধ্যমে উল্লেখ করা যায়-

সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার মাধ্যমে মুক্তি: 

একজন প্রকৃত বৈদান্তিক দার্শনিকের মতো বিবেকানন্দও মুক্তির বিষয়টিকে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন যে, মনুষ্যজাতির চরম লক্ষ্য হল মুক্তি লাভ করা। তার মতে, মুক্তি লাভ করার উপায় হল এই ক্ষুদ্র জীবন, এই ক্ষুদ্র জগৎ, এই পৃথিবী, এই স্বর্গ, এই শরীর এবং যা কিছু সীমাবদ্ধ তার সব কিছুকেই ত্যাগ করা। যখনই আমরা ইন্দ্রিয় ও মনের দ্বারা সীমাবদ্ধ এই ক্ষুদ্র জগৎ ত্যাগ করতে পারি, তখনই আমরা মুক্ত হই। বন্ধনমুক্ত হওয়ার একমাত্র উপায় হল সমস্ত নিয়মের বাইরে যাওয়া তথা ব্যাবহারিক কার্যকারণ শৃঙ্খলের বাইরে যাওয়া। অর্থাৎ, জাগতিক সমস্ত বিষয়েরই আসক্তি ত্যাগ করতে হবে।

প্রবৃত্তিমার্গ এবং নিবৃত্তিমার্গ-এর মাধ্যমে মুক্তি :

জগতের আসক্তি ত্যাগ করা অত্যন্ত কঠিন। অত্যন্ত কম লোকই এই আসক্তি ত্যাগ করতে পারে। আসক্তি ত্যাগের দুটি উপায় উল্লিখিত হয়েছে। এর একটি হল নিবৃত্তিমার্গ এবং অপরটি হল প্রবৃত্তিমার্গ। নিবৃত্তিমার্গে নেতি, নেতি (ইহা নয়, ইহা নয়) করে সমস্ত কিছুই ত্যাগ করতে হয়। আর প্রবৃত্তিমার্গে ইতি, ইতি (ইহা, ইহা) করে সমস্ত বস্তু গ্রহণ করার পরে ত্যাগ করতে হয়। অধিকাংশ লোকই প্রবৃত্তিমার্গ তথা সংসারের পথ বেছে নেয় এবং পরিশেষে ত্যাগ করে।

জ্ঞান ও কর্মের পথে মুক্তি: 

নিবৃত্তিমার্গে ত্যাগের বিষয়টি কেবলমাত্র উন্নতমনা অসাধারণ প্রবল ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষদের পক্ষেই সম্ভব। এরূপ মার্গটি অত্যন্ত কঠিন। নিবৃত্তিমার্গ হল জ্ঞানের পথ, কিন্তু প্রবৃত্তিমার্গ হল কর্মের পথ। জলস্রোত আপন গতিতে গর্তের মধ্যে পড়ে ঘূর্ণির মধ্যে কিছুক্ষণ আবর্তিত হয়ে আবার নিজ গতিতে বেগমান হয়। তেমনই মানুষ সংসারসমুদ্রে কিছুকাল আবর্তিত হয়ে, অবশেষে ত্যাগ করতে সক্ষম হয় এবং আপন মুক্তস্বভাব ফিরে পায়।

অনাসক্তভাবে কর্মসম্পাদনের মাধ্যমে মুক্তি

বিবেকানন্দ বলেন, কর্মযোগ আমাদের কর্মের রহস্য ও প্রণালী শিখিয়ে দেয়। কর্মযোগ বলে নিরন্তর কর্ম করো, কিন্তু কর্মে আসক্তি ত্যাগ করো। কোনো কিছুর সঙ্গে নিজেকে জড়িও না। মনকে সর্বদাই মুক্ত রাখো। যখনই আমরা আমাদের কৃতকর্মের সঙ্গে নিজেদেরকে অভিন্ন করি, তখনই আমরা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করি। এভাবেই আমরা সংসারবন্ধনে আবদ্ধ হই। অর্থাৎ 'আমি ও আমার'- এরূপ ভাবই হল সকল দুঃখের কারণ। অধিকারের ভাব থেকেই স্বার্থ আসে, আর এই স্বার্থপরতাতেই দুঃখের সূচনা হয়।

কর্মফল ত্যাগের মাধ্যমে মোক্ষ বা মুক্তি

মুক্তি পেতে গেলে প্রথমেই স্বার্থপরতার জাল ছিন্ন করতে হবে। অনাসক্ত চিত্তে সমস্ত কিছুকেই গ্রহণ ও বর্জন করতে হবে। অনাসক্তিই হল আমাদের সমস্ত যোগের মূলভিত্তি। যাঁরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী নন, তাঁরা নিজেদের ইচ্ছাশক্তি ও বিচার দ্বারা অনাসক্ত হয়। আর যাঁরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী, তাঁরা তাদের সমস্ত কর্ম ঈশ্বরে সমর্পিত করে অনাসক্ত হয়। এভাবেই সমুদয় কর্মফল ত্যাগ করতে হবে। সৎ কর্মের জন্যই সৎ কর্ম করতে হবে, তবেই সম্পূর্ণভাবে অনাসক্তি লাভ হবে। এভাবেই আমাদের হৃদয়গ্রন্থি ছিন্ন হবে এবং আমরা পরিপূর্ণ মুক্তি লাভ করতে সমর্থ হব। এরূপ মুক্তিই হল কর্মযোগের মূল লক্ষ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ