বিবেকানন্দের মতে উপলব্ধির পথগুলি কী?

বিবেকানন্দের মতে উপলব্ধির পথ

উপলব্ধি বলতে বিবেকানন্দ আত্মজ্ঞানের উপলব্ধিকেই বুঝিয়েছেন। এ হল আত্মার অমরত্বের উপলব্ধি। আত্মার সঙ্গে ব্রহ্মের একাত্মের উপলব্ধি। এরূপ উপলব্ধিই হল মানবজীবনের চরম ও পরম কাম্য। সাধক জীব সবসময়ই এরূপ উপলব্ধির পথেই এগিয়ে চলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই আত্মোপলব্ধির পথগুলি কী? এরূপ প্রশ্নের উত্তরে স্বামী বিবেকানন্দ বিভিন্ন প্রকার যোগ-এর কথা বলেছেন।

আত্মোপলব্ধিতে 'যোগ' শব্দটির অর্থ: 

যোগ শব্দটির অর্থ হল দুটি- 'একত্রিত বা সংযুক্ত হওয়া' আর 'নিয়মানুবর্তি বা অভ্যাস'। সাধারণত আমরা

এই দুটি অর্থের যে-কোনো একটিকে গ্রহণ করে থাকি। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ 'যোগ' বলতে এই দু-প্রকার অর্থকেই বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে, জীবের মুক্তিলাভই হল মৌল উদ্দেশ্য। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা পরমব্রত্মের সঙ্গে একাত্ম হয়ে 'অহং ব্রহ্মাস্মি'রূপে অভিহিত হই, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মুক্তি নেই। মুক্তির কামনায় আমাদের এই নিরন্তর প্রচেষ্টা কিন্তু কখনোই একমুখী নয়। এ হল এক বহুমুখী প্রচেষ্টা, কিন্তু প্রত্যেকটি প্রচেষ্টাই অবিদ্যার আবরণকে সরিয়ে মানুষকে পরমব্রত্মমুখী করে তোলে।

চতুর্বিধ পথে উপলব্ধি: উপলব্ধির বিভিন্ন পথকে বিবেকানন্দ চতুর্বিধরূপে উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল- জ্ঞানযোগ তথা জ্ঞানের পথ, ভক্তিযোগ তথা ভক্তির পথ, কর্মযোগ তথা কর্মের পথ এবং রাজযোগ তথা মনোবৈজ্ঞানিক পথ।

i. জ্ঞানযোগ: জ্ঞানযোগে শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের মাধ্যমে আত্মার স্বরূপের জ্ঞান হয়। জ্ঞানযোগকে বিবেকানন্দ জ্ঞানের পথরূপে উল্লেখ করেছেন। কারণ, এরূপ যোগের মাধ্যমে জীবের অজ্ঞতাজনিত বন্ধনের উপলব্ধি করা হয়। শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসন সহকারে আত্মাকে তার প্রকৃত স্বরূপে স্মরণ করিয়ে দেওয়াই হল জ্ঞানযোগের একমাত্র উদ্দেশ্য। আর এর দ্বারাই জীব আত্মতত্ত্ব লাভে সমর্থ হয় এবং মোক্ষ বা মুক্তিলাভে ধন্য হয়। যোগের এরূপ পথটিকে কঠিনতম বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ii. ভক্তিযোগ: ভক্তিযোগে ভক্তির দ্বারা পরাভক্তির ভাব জাগরিত হয়। ভক্তিযোগকে বলা হয় ভক্তির পথ। স্বামী বিবেকানন্দ মুক্তির এই পথটিকে সর্বাপেক্ষা সহজ, স্বাভাবিক ও সুখকর পথরূপে উল্লেখ করেছেন। ভক্তির অর্থ হল কোনো উচ্চতর বা উচ্চতম সত্তার প্রতি মানুষের অনুরক্তি বা অনুরাগ। এরূপ অনুরাগে মানুষ পরমব্রত্মকে পাওয়ার কামনা করে। সেজন্যই মানুষ তার হৃদয়ের ভত্তি দিয়ে তাঁকে তুষ্ট করতে চায়। পরিণামে মানুষ সেই পরমব্রত্নের সঙ্গে একাত্ম হতে চায়।

iii. কর্মযোগ: কর্মযোগে স্বার্থশূন্য নিষ্কাম কর্মের দ্বারা মুক্তি লাভ হয়। বিবেকানন্দ উপলব্ধির জন্য কর্মের পথকেই কর্মযোগ নামে উল্লেখ করেছেন। এ হল কর্মের দ্বারা চিত্তশুদ্ধির এক প্রয়াস। কর্ম হল দু- প্রকার-সকাম কর্ম ও নিষ্কাম কর্ম। সকাম কর্মের জন্য জীব বা মানুষকে তার কর্মফল ভোগ করতে হয়। কারণ, সকাম কর্ম হল জীবের কামনা-বাসনাজর্জরিত কর্মসমূহ। এই সমস্ত কর্মের হোতা হল জীব নিজেই। সেকারণে তার ফলভোগের দায়দায়িত্ব জীবেরই ওপর বর্তায়। এই ধরনের কর্ম হল অবিদ্যাজনিত অনৈতিক কর্মসমূহ। কিন্তু নিষ্কামভাবে যে কর্ম করা হয়, তাতে জীবের কোনো দায়দায়িত্ব থাকে না। সমস্ত কর্ম সেখানে ঈশ্বরেই সমর্পিত তাই এই কর্মের জন্য জীবকে ফলভোগ করতে হয় না। গীতা আমাদের এইরকম নিষ্কামভাবে কর্ম করার শিক্ষাই দেয়। নিষ্কামভাবে কর্মের ফলে মানুষের কোনো অহং বোধ থাকে না এবং সমস্ত কর্ম ঈশ্বরে সমর্পিত হওয়ায় মানুষের পক্ষে ঈশ্বর সান্নিধ্য লাভ সম্ভব হয়। এর ফলে জীব মোক্ষ তথা মুক্তিলাভে সমর্থ হয়।

iv. রাজযোগ: রাজযোগে দেহ-মন নিয়ন্ত্রণের দ্বারা পরব্রত্মের সান্নিধ্য লাভ হয়। রাজযোগ দেহমনকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে আত্মার যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধির পথ হিসেবে চিহ্নিত। একে মনোবৈজ্ঞানিক পথরূপেও উল্লেখ করা হয়। রাজযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমাদের বাহ্যজগৎ হল অন্তর্জগতের স্থূলরূপ মাত্র। কাজেই বহির্জগৎ হল কার্য এবং অন্তর্জগৎ হল কারণ। যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি-এই অষ্টাঙ্গিক মার্গের পথেই রাজযোগের অনুশীলন করা যায় এবং ঈশ্বর সান্নিধ্যের মাধ্যমে মোক্ষ বা মুক্তি লাভ করা যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ