মানবপ্রকৃতিতে অসীম সত্তার দিকটি কী?

মানবপ্রকৃতির অসীম সত্তার দিক

রবীন্দ্রনাথের মতে মানব প্রকৃতির অসীম সত্তার দিকটিকে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা যায় -

সসীমতার মধ্যেই অসীমতার অবস্থান:

রবীন্দ্রনাথ তাঁর'মানুষের ধর্ম' নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, মানবপ্রকৃতিতে যেমন তার সসীম সত্তার দিকটি পরিলক্ষিত হয়, তেমনই তার অসীম সত্তার দিকটিও প্রতিফলিত হয়। মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা, বিবেক, আবেগ-অনুরাগ, আকর্ষণ এবং আত্মপোলব্ধির মাধ্যমে অহরহ চেষ্টা করে চলেছে আপন সসীমতার বৃত্তের বাইরে যেতে। মানুষ প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেকে নিয়ে নিজেই মত্ত থাকলেও, এতে কিন্তু মানুষ কখনোই শেষপর্যন্ত সন্তোষ লাভ করতে পারে না। মানুষ চায় তার নিজের মত্ততার বাইরে বেরিয়ে এসে অসীমের স্বাদ পেতে। এর জন্য মানুষ সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট থাকে। কোনো বাধাই মানুষের এই ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তাই সে জানার আকুতি নিয়ে অজানাকে জানতে চায়, অচেনাকে চিনতে চায়। আর যা কিছুই অজানা, অচেনা বা অতীন্দ্রিয়, তা কখনোই মানুষের সীমাবদ্ধতার অন্তর্ভুক্ত নয়। তা হল তার সীমাবদ্ধতার বাইরে অসীমতার প্রকাশক। এই অসীম সত্তাকেই মানুষ উপলব্ধি করার চেষ্টা করে চলেছে অহরহ।

মানবপ্রকৃতিতে অসীম সত্তার দিকটি কী?


অহংভাবের বিনাশকরূপে অসীম সত্তা:

অসীমের প্রতি মানুষের আকর্ষণ তার অহংভাবকে ধ্বংস করে। সে অনুভব করতে পারে যে, দেহসর্বস্ব প্রকৃতিই কিন্তু মানুষের সব কিছু নয়। দৈহিক প্রকৃতির বাইরেও তার আরও একটি সুমহান পরিচয় আছে। এই গুণের সাহায্যেই মানুষের মধ্যেকার আধ্যাত্মিক দিকটিকে উন্মোচিত করা যায়। এই দিকটি ছাড়া মানুষ আসলে শুধুই দেহসর্বস্ব জীব, যা তার জৈবিক চাহিদাকে পূরণ করে মাত্র। এই জৈবিকতা বা পাশবিকতা ও সসীম সত্তার বাইরেও যে কিছু পাওয়ার আছে, এরূপ উপলব্ধি যখন মানুষের হয়, তখন সে এক-পা, এক-পা করে অসীম সত্তার দিকেই এগিয়ে যায়।

বিশ্বচেতনার দীপশিখায় অসীম সত্তা:

মানবপ্রকৃতির অসীমতার দিকটি প্রদীপের শিখার সঙ্গেই তুলনীয়। কারণ, শিখা শুধু নিজেকেই প্রকাশ করে না, তা তার বৃত্তের বাইরে অপরাপর বস্তুগুলিকেও প্রকাশ করে। মানুষের চেতনা যখন নিজেকে ছাপিয়ে, তার বাইরে যাত্রা করে, তখন তার মনে প্রজ্জ্বলিত হয় বিশ্বচেতনার দীপশিখা। এরূপ চেতনার দীপশিখায় মানুষের অহংবোধ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এভাবেই মানুষ নিজেকে জানতে পারে, অসীম বিশ্বকে চিনতে পারে। এভাবেই সামগ্রিকভাবে মানবাত্মাকে সে বুঝতে পারে। মানুষ তখন যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে মানুষ মানবতার পূজারি হয়ে ওঠে। এভাবেই সে 'সোহম্' বাণী বহন করে সকল মানুষকে ঐক্যমন্ত্রে দীক্ষিত করতে পারে। এরূপ বৃহত্তর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়াই মানুষের প্রকৃত ধর্ম।

অমরত্বের সন্ধানে অসীম সত্তা:

মানুষের মধ্যে এই অসীম সত্তার উপস্থিতির জন্যই মানুষ তার জীবনদেবতাকে খুঁজে নিয়ে মুক্তি পেতে চায়। এভাবেই মানুষ অমরতার জন্য আকুল হয়ে ওঠে। মানুষ জানে যে, 'জন্মিলে মরিতে হবে' তবুও সে অনুভব করে যে, মৃত্যুই জীবনের শেষ লক্ষ্য নয়, বৃহত্তর জীবনের সন্ধান পাওয়াই জীবনের চরম লক্ষ্য। মানুষের এই অসীমের চেতনাই তাকে অমরত্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।


সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার সূচনায় অসীম সত্তা:

রবীন্দ্রনাথের মতে, অসীমের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাকে সৃজনশীল করে তুলেছে। এরূপ সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীনতার ওপরও সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কারণ, মানুষ শুধুমাত্র তার নিজের স্বাধীন চেতনাতেই এই বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়। এ কোনো বহির্জগতের নির্দেশ নয়, এ হল অন্তরের উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত এক নির্দেশ। এর ফলে মানুষ আনন্দের অনুভূতি লাভ করে এবং সে নিজেকে নীচের স্তর থেকে ওপরে নিয়ে যেতে চায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন