হিউমের নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ আলোচনা করো।

হিউমের নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ


প্রখ্যাত দার্শনিক ডেভিড হিউম হলেন একজন খাঁটি অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক। অভিজ্ঞতাবাদী লক এবং বার্কলের অভিজ্ঞতাবাদের চরম পরিণতি লক্ষ করা যায় হিউমের দর্শনে। দর্শনের ইতিহাসে হিউম একজন প্রকৃত অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকরূপে গণ্য। কারণ, অভিজ্ঞতাবাদের চরম পরিণতি কী হতে পারে, তা তিনি তাঁর দর্শনচিন্তায় দেখানোর চেষ্টা করেছেন। অবশ্য এরূপ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে কিছু অসংগতি পরিলক্ষিত হয় এবং সেকারণেই তাঁকে কঠোর অভিজ্ঞতাবাদীরূপে গণ্য না করে, নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদীরূপেই উল্লেখ করা হয়।

অভিমুদ্রণ ও ধারণার মাধ্যমে জ্ঞানের গঠন: 


হিউমের মতে, আমাদের সমস্তপ্রকার জ্ঞান উৎসারিত হয় অভিজ্ঞতা থেকে। অভিজ্ঞতা বলতে হিউম ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষণকেই বুঝিয়েছেন। ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণকে তিনি দু- ভাগে বিভক্ত করেছেন- [1] অভিমুদ্রণ বা ইন্দ্রিয়জ (impression) এবং [2] ধারণা (idea)। অভিমুদ্রণ তথা ইন্দ্রিয়জ বলতে তিনি সাক্ষাৎভাবে ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণকেই বুঝিয়েছেন, আর ধারণা বলতে তিনি পরোক্ষ ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণকে উল্লেখ করেছেন। ধারণা হল ইন্দ্রিয়জের ক্ষীণ প্রতিরূপস্বরূপ। প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়জের মাধ্যমে আমরা একটা ধারণা গঠন করি। সুতরাং, ধারণা হল ইন্দ্রিয়জের অনুগামী। যখন আমরা কোনো একটি টেবিলকে চাক্ষুষভাবে প্রত্যক্ষ করি, তখন আমরা লাভ করি টেবিলটির ইন্দ্রিয়জ বা অভিমুদ্রণ। কিন্তু পরবর্তী পর্বে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষের বাইরে যখন আমরা ওই দেখা টেবিলটির কথা মনে করি বা ভাবি, তখন আমরা পাই ওই টেবিলটির ধারণা। তাঁর মতে, আমাদের সমস্তপ্রকার জ্ঞানই হল ইন্দ্রিয়জ অথবা ধারণা থেকে আগত। 

অতীন্দ্রিয় বিষয়কে অস্বীকার: 


হিউমের মতে, আমাদের এমন কোনো বিষয়ের জ্ঞান হতে পারে না, যা অভিমুদ্রণ অথবা ধারণাভিত্তিক নয়। তাঁর মতে অভিমুদ্রণ ভিন্ন ধারণা এবং ধারণা ভিন্ন জ্ঞানের কোনো অস্তিত্বই নেই। সেকারণেই তিনি বলেন যে, দ্রব্য, আত্মা এবং ঈশ্বর প্রভৃতি সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান হতে পারে না। তাঁর মতে, এই বিষয়গুলি অতীন্দ্রিয় এবং এগুলির কোনোটিরই অভিমুদ্রণ সম্ভব নয়। এগুলির কোনো ধারণা গঠন করাও তাই সম্ভব নয়। ফলে এই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে আমাদের কোনোপ্রকার জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়।

অভিমুদ্রণ ও ধারণার গ্রন্থন: 


হিউমের মতে, অভিমুদ্রণ এবং ধারণা জ্ঞানের মৌল ভিত্তিরূপে গণ্য হলেও, শুধু এগুলির প্রাপ্তিই জ্ঞান নয়। কারণ, এগুলির মধ্যে গ্রন্থনা বা সম্বন্ধের প্রয়োজন হয়। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্ন অভিমুদ্রণ ও ধারণাগুলি অনুষঙ্গের নিয়মে গ্রন্থনাবদ্ধ বা সম্বন্ধযুক্ত হয়ে জ্ঞানে পরিণত হয়। এই অনুষঙ্গের নিয়ম হল তিনটিㅡ[1] সাদৃশ্যের নিয়ম, [2] সান্নিধ্য নিয়ম এবং [3] কার্যকারণ নিয়ম। তাঁর মতে, এই তিনটি নিয়ম আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনুযায়ী কখনোই কাজ করে না, কারণ স্থায়ী মন বলে আমাদের কিছু নেই। 

সংশয়বাদে পরিণতিপ্রাপ্তি

হিউমের মতে, আমাদের সমস্তপ্রকার জ্ঞান হল দু-ধরনের-[1] জাগতিক বিষয়ের জ্ঞান এবং [2] ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান। জাগতিক বিষয়ের জ্ঞান আমরা লাভ করি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, যেমন-সূর্য পূর্বদিকে ওঠে। এই ধরনের জ্ঞান অভিজ্ঞতাভিত্তিক হলেও, তা আবশ্যিক নয়, আপতিক। অপরদিকে, ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান হল অভিজ্ঞতানিরপেক্ষ এবং পূর্বতঃসিদ্ধ। যেমন- দুই যুক্ত দুই সমান চার। এই ধরনের জ্ঞান অবশ্যম্ভাবী হলেও, এর মধ্যে কোনো অভিনবত্ব নেই। এই দু- প্রকার জ্ঞানের কোনোটিই যথার্থ নয়। কারণ, জ্ঞানকে যথার্থ হতে হলে নিশ্চয়তা এবং অভিনবত্ব—এই দুটি বৈশিষ্ট্যই থাকা দরকার। এই দু-প্রকার জ্ঞানের কোনোটিরই এই দুটি বৈশিষ্ট্য নেই এবং সেকারণেই হিউমের জ্ঞানতাত্ত্বিক মতবাদ সংশয়বাদ (Scepticism)-এ পরিণত হয়েছে। তাই সামগ্রিক বিচারে হিউমকে একজন নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদীরূপে গণ্য করাই সংগত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ