প্রচলিত শক্তি

কয়লা, খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, জলপ্রবাহ প্রভৃতি থেকে সাধারণত তিন ধরনের চিরাচরিত বা প্রচলিত শক্তি উৎপাদন করা হয়। যেমন-তাপবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ।

তাপবিদ্যুৎ শক্তি (Thermal Energy)


তাপবিদ্যুৎ শক্তির ধারণা: বিভিন্ন ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানি, যেমন-কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি দহন করে যে তাপশক্তি পাওয়া যায়, তার মাধ্যমে জলকে বাষ্পে রূপান্তরিত করা হয় এবং ওই বাষ্পশক্তির সাহায্যে টারবাইন ঘুরিয়ে যে গতিশক্তি উৎপন্ন হয় তাকে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ শক্তিতে পরিণত করা হয়ে থাকে, যা তাপবিদ্যুৎ নামে পরিচিত।

তাপবিদ্যুৎ শক্তির প্রকারভেদ: তাপবিদ্যুৎ শক্তিকে জ্বালানির উপর নির্ভর করে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়- কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ শক্তি, খনিজ তেল ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ শক্তি, প্রাকৃতিক গ্যাস ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ শক্তি। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল থেকে সৃষ্ট বিদ্যুৎশক্তিকে গ্যাস-নির্ভর বিদ্যুৎ ও ডিজেল-নির্ভর বিদ্যুৎ বলা যেতে পারে। 

ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রকসমূহ: জ্বালানির প্রাপ্যতা: কয়লা, খনিজতেল, প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতার
ওপর ভিত্তি করে তাপবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদিত হয়। যেমন-ভারতের পূর্বদিকে ঝরিয়া, রানিগঞ্জ, আসানসোল প্রভৃতি অঞ্চলের কয়লাখনিগুলির ওপর ভিত্তি করে দুর্গাপুর, ব্যান্ডেল, কোলাঘাট প্রভৃতি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিকাশ ঘটেছে। বিস্তৃত জমি: কয়লা দহনের ফলে উৎপন্ন ছাই ফেলার জন্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন অঞ্চলে বিস্তৃত জমি থাকা জরুরি। পর্যাপ্ত জলের জোগান: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি সাধারণত জলাশয়ের কাছাকাছি গড়ে ওঠে, কারণ উত্তপ্ত যন্ত্রপাতি ঠান্ডা করা এবং টারবাইন ঘোরানোর জন্য প্রয়োজনীয় বাষ্পশক্তি উৎপাদনের জন্য, পর্যাপ্ত জলের জোগান থাকা দরকার। মূলধন বিনিয়োগ: তাপবিদ্যুৎ শক্তি কেন্দ্রে কাঁচামালের জোগান ও তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হয়। আধুনিক প্রযুক্তি: স্বল্প খরচে অধিক মাত্রায় উৎপাদনের জন্য এক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ করা প্রয়োজন। 
পরিবেশ-মিত্র প্রযুক্তির প্রয়োগ: পরিবেশ দূষণজনিত সমস্যা প্রতিরোধের জন্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিবেশ-মিত্র প্রযুক্তির ব্যবহার করা উচিত। যেমন-ফুয়েল গ্যাস ট্রিটমেন্ট-এর সাহায্যে পৃথিবীতে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎপন্ন ছাই ও ধোঁয়া সংক্রান্ত সমস্যার মোকাবিলা করা যায়। বিস্তৃত বাজার: পরিমাণ (2016): উৎপন্ন ছাই ও ধোঁয়া সংক্রান্ত সমস্যার মোকাবিলা করা যায়। বিস্তৃত বাজার: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বিস্তৃত বাজারের অবস্থান থাকা প্রয়োজন। বাজার ও উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে স্বল্প দূরত্ব: বিদ্যুৎ-এর অপচয় কমানোর জন্য বাজার ও উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে স্বল্প দূরত্ব থাকা প্রয়োজন। বিকল্প শক্তির ঘাটতি: বিকল্প শক্তির ঘাটতি থাকায় তাপবিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি সহযোগিতা: অনুকূল সরকারি নীতি ও সরকারি তরফে বিনিয়োগ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিকাশে সাহায্য করে।

বিশ্বের প্রেক্ষিতে ভারত (India in World Respect) : 2016 খ্রিস্টাব্দের তথ্য অনুসারে চিন, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে পৃথিবীতে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। উপরোক্ত এই তিনটি দেশেই কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বেশি। ভারতে 2016 খ্রিস্টাব্দের তথ্য অনুসারে, মোট উৎপাদিত তাপবিদ্যুতের পরিমাণ 218329.88 মেগাওয়াট (MW) (68.31%), যার মধ্যে 192168.88 MW (60.13%), 25,329.38 MW (7.95%) ও 837.63 MW (0.26%) তাপবিদ্যুৎ যথাক্রমে কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও ডিজেল থেকে উৎপন্ন হয়। 

কয়লা-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহ: ভারতে মোট বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় 62%-এর অধিক পূরণ করা সম্ভব হয়, দেশের কয়লা ভাণ্ডারের সাহায্যে। এই দেশে সরকারি National Thermal Power Corporation (NTPC) ও বিভিন্ন রাজ্যস্তরের বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা এবং কিছু বেসরকারি সংস্থা কয়লা-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ভারতে বর্তমানে প্রায় 116টি কয়লা-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। 

প্রাকৃতিক গ্যাস-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহ: 2016 খ্রিস্টাব্দের তথ্য অনুসারে ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাস-নির্ভর
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির উৎপাদক্ষমতা হল প্রায় 24508.63 মেগাওয়াট (MW)। বর্তমানে ভারতে প্রায় 65টি প্রাকৃতিক গ্যাস-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। 

ডিজেল/খনিজ তেল-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র: ভারতে 2016 খ্রিস্টাব্দের তথ্য অনুসারে ভারতে ডিজেল-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় 993.53 মেগাওয়াট (MW) এবং মোট ডিজেল-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা হল প্রায় 19টি। 

তাপবিদ্যুৎ শক্তির সুবিধা: (1) তাপবিদ্যুৎ প্রধানত কয়লা ও খনিজ তেল উত্তোলক যে-কোনো অঞ্চলের কাছে বা দূরে উৎপাদন করা যেতে পারে। (2) এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ব্যয় যথেষ্ট কম হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশেও তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। (3) তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্রা চাহিদার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। (4) প্রচলিত শক্তি হওয়ায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গঠন ও তা থেকে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি যথেষ্ট সহজলভ্য।

তাপবিদ্যুৎ শক্তির সমস্যা: (1)  তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যয় যথেষ্ট বেশি। (2) তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেলের ভাণ্ডার বারংবার ব্যবহারের ফলে নিঃশেষিত হয়ে যায়। (3) কাঁচামালের পরিমাণগত ও গুণগত মান বজায় না থাকলে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সমস্যা ঘটে। (4) অনেক সময় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটায় বহু মানুষ ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। (5) তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন অঞ্চলে পরিবেশদূষণের মাত্রা যথেষ্ট বেশি থাকে।

জলবিদ্যুৎ শক্তি (Hydroelectric Energy)


জলবিদ্যুৎ শক্তির ধারণা: যে বিদ্যুৎ শক্তি খরস্রোতা নদী বা জলপ্রপাতের জলপ্রবাহের সহায়তায় টারবাইন ঘুরিয়ে ডায়নামোর মাধ্যমে উৎপাদিত হয়, তাকে জলবিদ্যুৎ শক্তি বলে। জলবিদ্যুৎ শক্তিকে সাদা কয়লা বা শ্বেত কয়লা (White Coal) বলা হয়, কারণ কালো বর্ণের কয়লা থেকে তাপবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদিত হয় এবং স্বচ্ছ, বর্ণহীন জল থেকে উৎপন্ন হয় জলবিদ্যুৎ শক্তি, তাপবিদ্যুৎ শক্তির সঙ্গে জলবিদ্যুৎ শক্তির তুলনা করে একে শ্বেত কয়লা বলা হয়।


জলবিদ্যুৎ শক্তি প্রকারভেদ: ব্যবহার যোগ্যতার ভিত্তিতে জলবিদ্যুৎ শক্তিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়-

সম্ভাব্য জলবিদ্যুৎ শক্তি: কোনো স্থানের প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাপ্ত জলপ্রবাহ শক্তি থেকে যে জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করা যেতে পারে, তাকে সম্ভাব্য জলবিদ্যুৎ শক্তি বলে। 2014 খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক জলবিজ্ঞান সংস্থা [World Hydrologi- cal Association (WHA)]-এর তথ্য অনুযায়ী এক্ষেত্রে এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানের অধিকারী।


প্রকৃত জলবিদ্যুৎ শক্তি


কোনো স্থানে যে জলবিদ্যুৎ শক্তি ওই অঞ্চলের জলপ্রবাহ শক্তি, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক অবস্থার সহায়তায় বাস্তবে উৎপাদন করা হয়, তাকে প্রকৃত জলবিদ্যুৎ শক্তি বলে। WHA-এর তথ্য অনুযায়ী এক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়া যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানের অধিকারী। 


ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রকসমূহ: জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযোগী ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রকগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়-১) প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক ও (১) আর্থসামাজিক নিয়ন্ত্রক।


জলবিদ্যুৎ শক্তির প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রকসমূহ: (a) বন্ধুর ভূমিরূপঃ বন্ধুর ভূমিভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর জলপ্রবাহের গতিবেগ যথেষ্ট বেশি থাকায় সহজেই টারবাইন ঘুরিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। যেমন-ভারতের পাঞ্জাবে ভাকরা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণাটকের শিবসমুদ্রম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, অন্দ্রপ্রদেশের তৃষ্ণাভরা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রভৃতি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চলে অবস্থান করছে। (b) মাঝারি তাপমাত্রা: জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অতিরিন্ত বেশি বা কম তাপমাত্রা সমস্যার 'সৃষ্টি করে। তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেশি থাকলে জল বাষ্পীভূত হয়ে যায়। অন্যদিকে শীতল নাতিশীতোয় অঞ্চলে অতিরিক্ত ঠান্ডায় জল জমে বরফে পরিণত হয়। (c) পর্যাপ্ত ও নিয়মিত জলের জোগান। হিমবাহ বা বরফাবৃত পর্বত থেকে উৎপন্ন নদীগুলি নিত্যবহ প্রকৃতির হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। আবার যেসব নদী অববাহিকায় সারাবছর নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়, সেখানেও নদীতে জলের পর্যাপ্ত জোগান থাকায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়। (d) পলিমুক্ত জল। নদীর জলে পলির পরিমাণ বেশি থাকলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পলিযুক্ত স্বচ্ছ জলের প্রয়োজন। (e) বনভূমির অবস্থান। বনভূমি মৃত্তিকাক্ষয় প্রতিরোধ করায় নদীতে পলি জমার সম্ভাবনা হ্রাস পায় এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণকেও প্রভাবিত করে। (f) হ্রদের উপস্থিতি: নদীর গতিপথে কোনো হ্রদের উপস্থিতি থাকলে সারাবছর জলের জোগান পাওয়া যায়, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পক্ষে বিশেষ সহায়ক। (g) গাঠনিক স্থিতিশীলতা: গাঠনিক দিক থেকে দুর্বল অঞ্চলে অনেক সময় ভূমিকম্প বা ভূমিধসের ফলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সুদৃঢ় ভূতাত্ত্বিক গঠনের উপস্থিতি প্রয়োজন।


জলবিদ্যুৎ শক্তি আর্থসামাজিক নিয়ন্ত্রকসমূহ: (a) চাহিদা। স্থানীয় অঞ্চলে পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকলে জলবিদ্যুৎ-এর উৎপাদন বিশেষ লাভজনক হয় না, কারণ উৎপাদিত বিদ্যুৎ দূরবর্তী স্থানে পরিবহণ করার ক্ষেত্রে সমস্যা লক্ষ করা যায়। (b) আধুনিক প্রযুক্তি: আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ছাড়া জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গঠন ও সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব নয়। (c) মূলধন বিনিয়োগ: পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চলে নদীতে বাঁধ নির্মাণ এবং বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য প্রচুর পরিমাণে মূলধন বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। (d) বহুমুখী নদী-উপত্যকা পরিকল্পনার প্রভাব: কোনো স্থানে সরকারি উদ্যোগে বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা গঠন করলে জলসেচ, মৎস্যচাষ, জলপরিবহণ, বন্যা প্রতিরোধ প্রভৃতি উদ্দেশ্য পূরণ ছাড়াও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়। (e) অন্যান্য শক্তিসম্পদের ঘাটতি: কোনো দেশে কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেলের অভাব থাকলে জলবিদ্যুতের চাহিল বৃদ্ধি পায়। যেমন-দক্ষিণ ভারতে খনিজ তেল ও কয়লার ঘাটতি থাকায় জলবিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, জাপান প্রভৃতি দেশেও এই কারণে জলবিদ্যুতের চাহিদা যথেষ্ট বেশি।


পৃথিবীতে জলবিদ্যুৎ শক্তির বণ্টন (World Distribution of Hydroelectric Energy): 

US En- ergy Information Administration (EIA)-এর 2015 খ্রিস্টাব্দের তথ্য অনুসারে পৃথিবীতে জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান দেশগুলি হল-চিন, ব্রাজিল, কানাডা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারত, নরওয়ে, ভেনেজুয়েলা, সুইডেন, জাপান প্রভৃতি। Energy Fact Book-এর তথ্য অনুযায়ী, 2014 খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল 3895 টেরাওয়াট/ঘণ্টায়।


জলবিদ্যুৎ শক্তি-কানাডা: Energy Fact Book-এর তথ্য অনুযায়ী 2014 খ্রিস্টাব্দে কানাডায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল 78317 মেগাওয়াট। কানাডা পৃথিবীতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে তৃতীয় স্থানের অধিকারী। পৃথিবীর মোট জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের 10% কানাডা উৎপাদন করে থাকে।


ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রকসমূহ: কানাডায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রকগুলি হল- (a) অনুকূল ভূপ্রকৃতি: কানাডার শিশু অঞ্চল বন্ধুর মালভূমি হওয়ায় এখানে সহজেই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়। (b) অনুকূল জলবায়ু: কানাডার পশ্চিম দিক ও দক্ষিণ দিকে নাতিশীতোয় জলবায়ুর প্রভাব থাকায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পক্ষে উপযোগী। (c) জলপ্রপাতের অস্তিত্ব: কানাডার দক্ষিণ দিকে নায়াগ্রা জলপ্রপাত ও পূর্ব দিকে প্রপাতরেখার অবস্থান জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পক্ষে সহায়ক। (d) নিয়মিত জলের জোগান: কানাডার সেন্ট-লরেন্স, টেনেসি, কলম্বিয়া প্রভৃতি নদীতে সারাবছর বরফগলা জল ও বৃষ্টির জলের জোগান থাকায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন যথেষ্ট সুবিধাজনক হয়।

(e) চাহিদা: কানাডায় বিভিন্ন শিল্প, যেমন-কাষ্ঠমণ্ড, কাগজ, ধাতু নিষ্কাশন প্রভৃতির বিকাশ ঘটায় ও গৃহস্থালির প্রয়োজনে জলবিদ্যুতের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। (f) অন্যান্য শক্তিসম্পদের ঘাটতি: কানাডায় খনিজ তেল, কয়লা প্রভৃতি অপুনর্ভব শক্তি সম্পদের ঘাটতি থাকায় কানাডায় জলবিদ্যুতের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। (g) আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি নীতি: কানাডা প্রযুক্তিবিদ্যায় যথেষ্ট উন্নত এবং কানাডায় সরকারি নীতি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাহায্য করে।

জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বণ্টন

কানাডায় মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের 63% হল জলবিদ্যুৎ। উৎপাদনের প্রায় 92% বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ব্রিটিশ কলম্বিয়া, ম্যানিটোবা, ইউকাতান, কুইবেক, ল্যাব্রাডর ও নিউফাউন্ডল্যান্ড-এ। এই দেশে প্রায় 576টি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। 


স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশসমূহঃ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলি মূলত ইউরোপের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ভূপ্রাকৃতিক স্থান, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলি হল নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড। এই দেশগুলি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে অত্যন্ত সমৃদ্ধ কারণ এই অঞ্চলগুলি পর্বত ও মালভূমি অধ্যুষিত হওয়ায় এখানকার নদীগুলি পলিমুক্ত ও খরস্রোতা প্রকৃতির।


A. জলবিদ্যুৎ শক্তি - নরওয়ে: নরওয়ের মোট উৎপাদিত বিদ্যুৎ-এর 95% হল জলবিদ্যুৎ। 2014 খ্রিস্টাব্দের পরিসংখ্যান অনুসারে নরওয়ের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ 131 টেরাওয়াট/ঘন্টা। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে পৃথিবীতে নরওয়ের স্থান সপ্তম এবং মাথাপিছু জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে (26 হাজার কিলোওয়াট/ঘণ্টা) নরওয়ের স্থান প্রথম। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নরওয়ের স্থান দ্বিতীয়।


ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রকসমূহ: নরওয়েতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বিকাশের মুখ্য নিয়ন্ত্রকগুলি হল-(1) বন্ধুর ভূমিভাগ, (ii) পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, (iii) অধিক তুষারপাত, (iv) তুষার গলা জলে পুষ্ট অসংখ্য নদী, (v) কয়লা ও খনিজ তেলের ঘাটতি, (vi) জলবিদ্যুতের অধিক চাহিদা, (vii) প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ, (viii) আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ।


জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বণ্টন: নরওয়ের প্রধান জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি হল-(৯) নটোডেন: নটোডেন অসলো ফিয়র্ড-এর দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। কৃত্রিম নাইট্রোজেন, অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, নাইট্রেট প্রভৃতি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিতে নটোডেন-এ। উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। (b) সার্পস্বর্গ: এটি অসলো ফিয়র্ডের পূর্বদিকে গ্রোমেন নদী সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত। দস্তা ও ক্যালশিয়াম কার্বাইড প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে সার্পসবর্গ-এর জলবিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। (c) মো-ই-রানা: কুমেরু বৃত্তের কিছুটা দক্ষিণে উত্তর নরওয়ের রানা ফিয়র্ডে মো-ই-রানা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি অবস্থিত। প্রধানত সংলগ্ন ইস্পাত শিল্পে এই কেন্দ্রের জলবিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। (d) অন্যান্য: নরওয়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি হল-টনস্ট্যান্ড, আউরল্যান্ড, টাইন, কিভিলডল (নরওয়ের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র)। নরওয়ে-তে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ বহুল পরিমাণে এই দেশের কাষ্ঠ ও কাগজ শিল্পে এবং ধাতব শিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, মাছ সংরক্ষণ শিল্প ও রাসায়নিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়। 


B. জলবিদ্যুৎ শক্তি-সুইডেন: সুইডেন-এ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি পরিমাণ আসে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে। সমগ্র দেশে প্রায় 1900-এর বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। প্রায় 45টি কেন্দ্রে 100 মেগাওয়াট (MW)-এর বেশি, 17টি কেন্দ্রে 200 MW-এর বেশি এবং ৩টি কেন্দ্রে 400 MW-এর বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। লুলে নদীর ঊর্ধ্বপ্রবাহে সুইডেনের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হারসপ্রানগেট গড়ে উঠেছে। 2014 খ্রিস্টাব্দের তথ্য অনুসারে পৃথিবীতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে সুইডেনের স্থান দশম (63.92 টেরাওয়াট/ঘন্টা)।


ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রকসমূহ: সুইডেনের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য যে নিয়ন্ত্রকগুলি মুখ্য ভূমিকা পালন করে, সেগুলি হল-(i) বন্ধুর ভূমিরূপ, (ii) অসংখ্য খরস্রোতা নদী, (iii) জীবাশ্ম জ্বালানির অভাব, (iv) প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ, (v) শিল্পক্ষেত্রে যেমন-কাগজ, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ প্রভৃতি শিল্পে এবং পরিবহণ ক্ষেত্র ও শহরে জলবিদ্যুতের ব্যাপক চাহিদা, (vi) আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ প্রভৃতি।


জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বণ্টন: (i) হারসপ্রানগেট: সুইডেনের এই সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি হারসপ্রানগেট প্রদেশে অবস্থিত। এই কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা 977 MW (Source: International Energy Agency)। (ii) স্টর্ননরফর্স: নরফর্ম প্রদেশে উম নদীর ওপরে এই কেন্দ্রটি অবস্থিত। এই কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা হল প্রায় 693 MW। (iii) পরজাস: সুইডেনের এই বৃহৎ ও অত্যন্ত প্রাচীন জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি পরজাসের কাছে গড়ে উঠেছে। এই কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা হল প্রায় 442 মেগাওয়াট। (iv) যুকটান পাম্পড-স্টোরেজ: গুন্নাম-এর কাছে যুকটান নদীর ওপরে গঠিত এই কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা হল প্রায় 338 মেগাওয়াট। (v) হোজাম: হোজাম জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি ট্রলহাট্রেন প্রদেশের দ্বিতীয় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। এই কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় 173 মেগাওয়াট। (vi) ওলিডান: ওলিডান সুইডেনের সর্বপ্রথম বৃহদায়তন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ট্রলহাট্রেন প্রদেশের গোতা নদীর তীরে অবস্থিত এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় 133 মেগাওয়াট।


C. জলবিদ্যুৎ শক্তি-ফিনল্যান্ড: জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলির মধ্যে ফিনল্যান্ড বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ফিনল্যান্ড-এ 2016 খ্রিস্টাব্দে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ 15634 গিগাওয়াট/ঘণ্টা (Gwh)। তবে 2016 খ্রিস্টাব্দে বিগত বছরের তুলনায় জলবিদ্যুতের উৎপাদন প্রায় 6% হ্রাস পেয়েছে। এই দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় 21% হল জলবিদ্যুৎ।


ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রকসমূহ: ফিনল্যান্ডের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নতির কারণগুলি হল-(i) বন্ধুর ভূমিরূপ, (ii) লিভা, কেমি প্রভৃতি খরস্রোতা নদীর উপস্থিতি, (iii) জীবাশ্ম জ্বালানির অভাব, (iv) শীতকালে ঘর গরম রাখতে এবং পরিবহণ ও শিল্পক্ষেত্রে জলবিদ্যুতের বিপুল চাহিদা, (v) প্রচুর মূলধন বিবিয়োগ, (vi) আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ প্রভৃতি।


জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের বণ্টন: ফিনল্যান্ড-এর উল্লেখযোগ্য জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি হল- (1) পামিলো নদীর ওপর গঠিত ভেট্রেনফল (ফিনল্যান্ড-এর সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র), (ii) এই দেশের দীর্ঘতম নদী কেমিজোকিতে গঠিত রোডানিয়াম, (iii) ওউলুজোকি নদীর উপর অবস্থিত পাইহাকোল্কি, মোন্টা প্রভৃতি। (iv) লাল্লি নদীর ওপর গঠিত আইসোহারা, সেইটাকোর্ডা। 


D. জলবিদ্যুৎ শক্তি-অইসল্যান্ড: আইসল্যান্ড-এর প্রায় ৪০%-এর বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে। আইসল্যান্ড-এ 2014 খ্রিস্টাব্দে প্রায় 12.75 টেরাওয়াট/ঘণ্টা (Twh) জলবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। মাথাপিছু মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং মাথাপিছু জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে আইসল্যান্ড যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী। আইসল্যান্ড-এর সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হল ক্যারনজুকার (690 মেগাওয়াট/ঘন্টা)। এই দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি হল-বারফেলেসন্টো (270 MW), রনদুন্ডু, সালতারতাঙ্গুত্ত্ব (120 MW), সিগোলদুন্ডু (150 MW), ভাটনাসফেলেস্টো (90 MW), হাউনেজাফুন্ডু প্রভৃতি।


E. জলবিদ্যুৎ শক্তি-ডেনমার্ক: ডেনমার্কের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় যথেষ্ট কম (2014 খ্রিস্টাব্দে প্রায় 15 গিগাওয়াট/ঘণ্টা)। ডেনমার্কে বন্ধুর ভূমিভাগের অভাবে নদীগুলি খরস্রোতা প্রকৃতির নয় এবং এর ফলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও অত্যন্ত কম পরিমাণে হয়। এই দেশের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র হল জুটল্যান্ডের গুডেনিয়ান নদীর উপরে গঠিত ট্যানগেভারকেট, যার উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র 4 মেগাওয়াট।


জলবিদ্যুৎ শক্তির সুবিধা: জলবিদ্যুৎ শক্তির প্রধান সুবিধাগুলি হল- (i) জলবিদ্যুৎ শক্তিকে পুনর্ভধ বা প্রবহমান শক্তি বলে। কারণ বারংবার ব্যবহার করলেও এই শক্তির ভান্ডার নিঃশেষিত হয় না। (ii) এটি একটি পরিবেশ-মিত্র প্রকৃতির শক্তি, কারণ এর প্রভাবে পরিবেশদূষণ হয় না। (iii) জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গঠনের ক্ষেত্রে আবর্তক বা পৌনঃপুনিক খরচ যথেষ্ট কম। (iv) জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস হল জলপ্রবাহ। তাই এই শক্তি উৎপাদনের জন্য কোনো কাঁচামাল সংরক্ষণ করার দরকার হয় না। (v) জলবিদ্যুতের বিভাজ্যতা তুলনামূলক মূলক বেশি হওয়ায়, আধুনিক শিল্পে এই শক্তির ব্যবহারও বেশি। (vi) বিভিন্ন অপুনর্ভব সম্পদ (যেমন-কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল) এক স্থান থেকে অন্যত্র পরিবহণের জন্য নলপথ অথবা আলাদা কোনো যানবাহনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু জলবিদ্যুৎ অত্যন্ত সহজে ট্রান্সমিশন লাইন (Transmission Line)- এর সাহায্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবাহিত হয়। (vii) জলবিদ্যুৎ থেকে বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানিগুলির তুলনায় বেশি তাপ উৎপাদিত হয়। যেসব ধাতব শিল্পে বেশি তাপ প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে জলবিদ্যুৎ শক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। (viii) তাপবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের তুলনায় জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে কম সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।


জলবিদ্যুৎ শক্তির সমস্যা: (i) বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানিগুলির মতো জলবিদ্যুৎ সঞ্চয় করা সম্ভব হয় না। (ii) জলবিদ্যুৎ থেকে কয়লা ও খনিজ তেলের মতো কোনো উপজাত দ্রব্য পাওয়া সম্ভব নয়। (iii) জলপ্রবাহের গতিবেগ কম থাকলে সেখানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। (iv) জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গঠনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি এবং যথেষ্ট মূলধন বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, যা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে অনেকক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। (ঘ) জলবিদ্যুৎ শুধুমাত্র শক্তি সম্পদ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, এর অন্য কোনো ব্যবহার নেই।

পারমাণবিক শক্তি (Nuclear Energy)


পারমাণবিক শক্তির ধারণা

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পরমাণুর বিভাজন ঘটিয়ে যে শক্তি উৎপাদন করা হয়, তাকে বলে পারমাণবিক শক্তি। পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান কাঁচামালগুলি হল-ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, লিথিয়াম, প্লুটোনিয়াম, ভারী জল, হাইড্রোজেন প্রভৃতি। পৃথিবীতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপাদিত হয়।

উৎপাদন প্রক্রিয়া

পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান দুটি প্রক্রিয়া হল-ফিসন (Fission) এবং ফিউসন (Fusion)। ফিসন হল এমন একটি বিভাজন পদ্ধতি যার মাধ্যমে একটি নিউক্লিয়াসের বিভাজন ঘটে অসংখ্য নিউক্লিয়াস গঠিত হয় এবং এই সময় নির্গত তাপ থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তাই হল পারমাণবিক বিদ্যুৎ। অন্যদিকে ফিউসন হল এমন একটি সংযোজন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে পরমাণুর দুটি নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে একটি নিউক্লিয়াস গঠন করে। এর ফলে যে বিশাল পরিমাণ তাপ উৎপাদিত তার সাহায্যে শুধুমাত্র হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করা ছাড়া আর কোনো উৎপাদনমূলক কাজ করা সম্ভব নয়।

পারমাণবিক শক্তি-প্রধান উৎপাদনকারী দেশসমূহ

2017 খ্রিস্টাব্দে International Atomic Energy- এর পরিসংখ্যান অনুসারে পৃথিবীর 30টি দেশে প্রায় 449টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কার্যকরী রয়েছে এবং 15টি দেশে প্রায় 60টি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গঠন করা হচ্ছে। 1956 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের ক্যালডার। হল-এ পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

পারমাণবিক শক্তি-ভারত: 2016 খ্রিস্টাব্দে ভারতে মোট উৎপাদিত বিদ্যুৎ-এর মধ্যে 35000 গিগাওয়াট/ঘণ্টা (Gwh) হল পারমাণবিক বিদ্যুৎ। বর্তমানে ৪টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে 22টি রি-অ্যাক্টর কার্যকরী আছে, যেগুলির মোট উৎপাদন ক্ষমতা 6780 মেগাওয়াট (MW)। ভারত পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে পৃথিবীতে একাদশ স্থানের অধিকারী (2015 খ্রিস্টাব্দ)। ভারতের প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি হল-(1) মহারাষ্ট্রের তারাপুর (1400 MW), (ii) রাজস্থানের রাওয়াতভাটা (1180 MW), (iii) তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম (2000 MW), (iv) কর্ণাটকের কৈগা (880) MW), (v) গুজরাটের কাকরাপাড় (440 MW), (vi) তামিলনাড়ুর কালপক্কম (440 MW), (vii) উত্তরপ্রদেশের নারোরা (440 MW)। এ ছাড়া উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর, গুজরাটের কাকরাপাড় ইউনিট-3 ও 4, রাজস্থানের রাজস্থান ইউনিট-7 ও ৪, তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম; অন্ধ্রপ্রদেশের পুলিভেন্দুলা; মহারাষ্ট্রের জইতাপুর প্রভৃতি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি গঠনের কাজ চলছে।

পারমাণবিক বিদ্যুতের সুবিধা

(i) পরিবহণ ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তির গুরুত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ভাণ্ডার নিঃশেষের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তির উৎস হল পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তি। (ii) 12000 মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যেখানে 6000 টন কয়লার প্রয়োজন হয়, সেখানে মাত্র 1 পাউন্ড ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম থেকে এই একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। অর্থাৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কাঁচামালের ব্যবহার যথেষ্ট কম মাত্রায় করা হয়। (iii) সমুদ্রের জলকে লবণমুক্ত করার জন্যও এই বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহৃত হয়। (iv) পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গঠনের ক্ষেত্রে আবর্তক ব্যয় (Recurring Expenditure) যথেষ্ট কম হওয়ায় অত্যন্ত সুলভে এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হয়। (v) পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি কৃত্রিম উপগ্রহে শক্তির জোগান দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়।

পারমাণবিক শক্তির সমস্যা: (i) পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রধান কাঁচামাল, যেমন-ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম প্রভৃতি সর্বত্র পাওয়া যায় না। (ii) শক্তি উৎপাদনের সময় দুর্ঘটনা বা অন্যান্য কারণে নির্গত তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারিপার্শ্বিক অঞ্চলের মানুষসহ বিভিন্ন জীবের স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার করে। (iii) পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় বর্জ্যগুলি সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশকে ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। (iv) পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ব্রিডার রি-অ্যাক্টর যথেষ্ট ব্যয়বহুল হওয়ায় অনুন্নত দেশগুলি এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবসময় সক্ষম হয় না। (v) পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে পরমাণু বোমা তৈরি করা যেতে পারে। যুদ্ধের সময় এই বোমার ব্যবহার কোনো অঞ্চলকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে। (vi) পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের উপযোগী প্রযুক্তি পৃথিবীর সব দেশের পক্ষে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। 

Faqs

Q. প্রচলিত শক্তি কি?

Ans: কয়লা, খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, জলপ্রবাহ প্রভৃতি থেকে সাধারণত তিন ধরনের চিরাচরিত বা প্রচলিত শক্তি উৎপাদন করা হয়। যেমন-তাপবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ।

Q. প্রচলিত শক্তির কিছু উদাহরণ কি?
Ans: প্রচলিত শক্তির কিছু উদাহরণ - তাপবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ।
Q. জলবিদ্যুৎ কি প্রচলিত শক্তি ?
Ans: হ্যাঁ জলবিদ্যুৎ প্রচলিত শক্তি ৷ 
Q. অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার বাড়ছে কেন ?
Ans : অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার বাড়ছে কারণ এটি নতুন এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগের ফলে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নত সুবিধা এবং সুস্থিতি উন্নতি করতে সাহায্য করতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ