আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের মহামন্দার প্রভাব আলোচনা করো।

১৯২৯-'৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমেরিকায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। এই সংকট শুধু আমেরিকাকে নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ঐতিহাসিক ই এইচ কার বলেছেন যে, "অর্ধেক ইউরোপ দেউলিয়া হয়ে যায় এবং বাকি অর্ধেক দেউলিয়া হওয়ার অবস্থার সম্মুখীন হয়।"

মহামন্দার ফলাফল/প্রভাব

বিশ্ব-অর্থনীতি তথা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের অর্থনৈতিক মন্দার বহুমুখী প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেমন-

[1] শেয়ার বাজারে ধস: আমেরিকার বহু মানুষ অল্প সময়ে বেশি আর্থিক লাভের আশায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শেয়ার বাজারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দার ফলে তাদের কেনা শেয়ারগুলির দাম দ্রুত কমে যায়। ফলে তারা ক্রয়মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে তাদের শেয়ারগুলি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এভাবে তারা ব্যাপক আর্থিক লোকসানের শিকার হয়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়।

[2] ব্যাংক ব্যবস্থায় বিপর্যয়: শেয়ার বাজারের তেজিভাব লক্ষ করে মহামন্দার পূর্বে বহু ব্যাংক তাদের মূলধন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে শেয়ার বাজারে ধসের ফলে ব্যাংকগুলির প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়। তাছাড়া ঋণদাতাদের কাছ থেকেও ব্যাংকগুলি তার প্রাপ্য ঋণের অর্থ ফেরত পায়নি। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আমেরিকায় অন্তত ৫৭০টি ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায় এবং ৩৫০০টি ব্যাংক তাদের লেনদেন বন্ধ করে দেয়। 

[3] লগ্নিকারীদের ক্ষতি: আতঙ্কিত হয়ে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক সাধারণ লগ্নিকারী ব্যাংক থেকে নিজেদের টাকা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু একসঙ্গে এত বেশি আমানতকারী টাকা তুলে নিতে চাওয়ায় ব্যাংকগুলি আমানতকারীদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়। নিজেদের গচ্ছিত টাকা ফেরত না পেয়ে বহু আমানতকারী নিঃস্ব হয়ে যায়। 

[4] কৃষি-সংকট: মহামন্দার ফলে আমেরিকায় তীব্র আর্থিক সংকট দেখা দিলে কৃষিপণ্যের মূল্য ব্যাপক হ্রাস পায়। ফলে কৃষকরা অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেসব কৃষক ব্যাংক-ঋণ নিয়ে খামারগুলি কিনেছিল, তারা এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন। ফলে ব্যাংকগুলি তাদের খামারগুলি কেড়ে নেয় এবং কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

5] বেকার সমস্যা: আর্থিক সংকটের ফলে শিল্পপণ্য বিক্রি ভীষণভাবে [ কমে গেলে বহু মালিক তাদের কারখানা হয় বন্ধ করে দিতে বা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হন। ফলে কারখানায় ব্যাপক হারে শ্রমিকছাঁটাই শুরু হয় এবং বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়ে।

[6] বাণিজ্যে বিপর্যয়: মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিও শেয়ার বাজারে মূলধন বিনিয়োগ করে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলধন নষ্ট হওয়ার ফলে তাদের ব্যাবসাবাণিজ্য দারুণভাবে ব্যাহত হয়। মার্কিন বাণিজ্যে এই বিপর্যয় বিশ্ববাণিজ্যে ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। 

[7] ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ: তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের শিকার হয়ে আমেরিকা বৈদেশিক ঋণপ্রদান বন্ধ করে দেয়। মার্কিন ঋণ না পেয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের বৈদেশিক ঋণ, ক্ষতিপূরণ প্রভৃতির কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়।

[ ৪] সোনা রপ্তানি নিষিদ্ধ: আর্থিক সংকটের শিকার হয়ে বহু দেশ তাদের সোনা আমেরিকায় রপ্তানি করে মার্কিন পণ্য ক্রয় করত। ফলে বহু দেশের সোনার ভাণ্ডার নিঃস্ব হয়ে গেলে তারা সোনা রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।

[9] অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা: মহামন্দার সংকট থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বহু দেশ অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদী নীতি গ্রহণ করায় বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটে ও উদার অর্থনীতি ক্রমে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়ে।

[10] রাজনৈতিক আদর্শে প্রভাব: অর্থনৈতিক সংকটের ফলে-
[i] বিভিন্ন দেশে একনায়কতন্ত্রের উত্থানের পথ সহজ হলে বিশ্বের নিরাপত্তা বিঘ্ন হয়। [ii] ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

[11 ] হুভার স্থগিতকরণ: ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে বিভিন্ন দেশে মহামন্দা তীব্র আকার ধারণ করে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি হুভার ঘোষণা (২০ জুন, ১৯৩৩ খ্রি.) করেন যে, বিদেশি রাষ্ট্রগুলি কর্তৃক আমেরিকাকে ঋণ পরিশোধের বিষয়টি ১ বছর স্থগিত থাকবে। এই ঘোষণা 'হুভার স্থগিতকরণ' নামে পরিচিত।

মূল্যায়ন: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট দূর করার উদ্দেশ্যে ৬৪টি দেশের প্রতিনিধিরা ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলনে সমবেত হন। কিন্তু এই সম্মেলন সফল হয়নি। এরপর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট তাঁর 'নিউ ডিল' বা নতুন ব্যবস্থার কথা ঘোষণার মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনৈতিক সংকট দূর করার উদ্যোগ নেন। 
Read More 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ