কারণ কার্যের নিয়ত পূর্ববর্তী ঘটনা মাত্র।"—এই মতবাদের সপক্ষে যুক্তিগুলি কী?

কারণ কার্যের নিয়ত পূর্ববর্তী ঘটনা মাত্র।"-মতবাদের সপক্ষে যুক্তি


"কারণ কার্যের নিয়ত পূর্ববর্তী ঘটনা মাত্র।"-এই অভিমতটি হল ডেভিড হিউমের। কার্যকারণ বিষয়ে হিউমের মতবাদের সপক্ষে যেসকল যুক্তিগুলি উল্লেখ করা যায়-

[1] কার্যের নিয়ত পূর্ববর্তী ঘটনা হিসেবে কারণ:

একজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক হিসেবে হিউম কার্য ও কারণের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী মতবাদকে কখনোই স্বীকার করেননি। তিনি অভিজ্ঞতাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কার্যকারণ সম্বন্ধকে ব্যাখ্যা করেছেন। এভাবেই তিনি একদিকে বুদ্ধিবাদীদের কার্যকারণ সম্পর্কিত অনিবার্য মতবাদটিকে খণ্ডন করেছেন, অপরদিকে স্বমত প্রতিষ্ঠা করে কারণকে কার্যের নিয়ত পূর্ববর্তী ঘটনারূপে উল্লেখ করেছেন।

[2] অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনাকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় পাওয়ার অপারগতা: 

হিউম কার্যকারণের মধ্যেকার অনিবার্যতা সংক্রান্ত মতবাদকে অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, কার্য ও কারণের মধ্যে অনিবার্য সম্বন্ধ থাকলে আমরা এ কথা মেনে নিতে বাধ্য যে, সর্বকালেই কারণের উপস্থিতিতে কার্যটি ঘটে। অর্থাৎ, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমস্তকালেই এরূপ ঘটনা ঘটতে বাধ্য। কিন্তু অভিজ্ঞতায় আমরা কখনোই অতীত ও ভবিষ্যৎকালীন বিষয় সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য করতে পারি না। কারণ, অতীত ও ভবিষ্যতের বিষয়কে কখনোই আমাদের প্রত্যক্ষজাত অভিজ্ঞতায় পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং, কার্য ও কারণের মধ্যে যে অনিবার্য সম্বন্ধ আছে এমন দাবি করা একেবারেই সংগত নয়। 

[3] কারণ থেকে কার্যের অভিজ্ঞতা পাওয়ার অপারগতা:

বুদ্ধিবাদীরা কার্যকারণের মধ্যে অনিবার্য সম্বন্ধকে যে যৌক্তিক প্রসক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন, তা অযৌক্তিক। কারণ, তর্কবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে প্রসক্তি সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, তাতে যুক্তিবাক্যকে বিশ্লেষণ করলে সিদ্ধান্তটি পাওয়া সম্ভব; কিন্তু কার্যকারণ সম্বন্ধের ক্ষেত্রে কারণকে বিশ্লেষণ করলে কখনোই কার্যটির অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় না। যেমন-দুধ হল পুষ্টির কারণ-এরূপ ক্ষেত্রে দুধকে বিশ্লেষণ করলে কখনোই পুষ্টির বিষয়টি অভিজ্ঞতায় পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং, কার্যকারণের অনিবার্য সম্পর্ককে মেনে নেওয়া সংগত নয়।

[4] কার্য ও কারণের মধ্যে সতত সংযোগ তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা: 

হিউম দাবি করেন যে, আমরা কারণ ও কার্য নামক দুটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে অভিজ্ঞতায় লাভ করি। এরূপ ঘটনা দুটি বিচ্ছিন্ন হলেও আমরা এদের মধ্যে একপ্রকার সান্নিধ্য বা পৌর্বাপর্য পর্যবেক্ষণ করি। এরূপ পৌর্বাপর্য পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে কোনোরূপ ব্যতিক্রম লক্ষ করি না। এর ফলে ঘটনা দুটির মধ্যে আমাদের মনে একপ্রকার অনুষঙ্গের ধারণা গঠিত হয়। আমরা তাই মানসিক অভ্যাসবশত একটিকে দেখে আর-একটিকে প্রত্যাশা করে থাকি। এক্ষেত্রে আমরা মনে করি যে, এই দুটি ঘটনার মধ্যে একপ্রকার কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে। এরূপ কার্যকারণ সম্বন্ধ হল দুটি ঘটনার মধ্যে নিয়তসংযোগ বা সতত সংযোগ। এরূপ সম্বন্ধ কখনোই আবশ্যিক বা অনিবার্য সম্বন্ধ নয়। সুতরাং, হিউম দাবি করেন যে, কারণ হল কার্যের নিয়ত পূর্ববর্তী ঘটনা।

উপসংহার: কারণ কার্যের নিয়ত পূর্ববর্তী ঘটনা-এরূপ বলার মাধ্যমে হিউম প্রথমে কার্য ও কারণের মধ্যে আবশ্যিক সম্বন্ধকে অস্বীকার করেছেন। এরপর তিনি কার্য ও কারণ নামক ঘটনা দুটিকে কালিক পূর্বাপর সম্বন্ধরূপে ব্যতিক্রমহীনভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। যেমন- ধূমের সঙ্গে বহ্নির সতত সংযোগ আমরা ব্যতিক্রমহীনভাবে বারবার দেখেই বলতে পারি যে, ধূম হল বহ্নির কারণ। সুতরাং, কারণ হল কার্যের নিয়ত পূর্ববর্তী ঘটনা মাত্র এবং এদের পারস্পরিক সম্বন্ধ হল সতত সংযোগের সম্বন্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ