কার্যকারণ সম্পর্কে অনিবার্য মতবাদটি আলোচনা করো।

কার্যকারণ সম্পর্কে অনিবার্য মতবাদ

কার্যকারণ সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে যে-সমস্ত মতবাদ পরিলক্ষিত হয়, তাদের মধ্যে অনিবার্য তথা প্রসক্তি তত্ত্বটি হল অন্যতম। কার্যকারণ সম্পর্কে এরূপ মতবাদটি মূলত বুদ্ধিবাদীদের মতবাদ রূপেই গণ্য। বুদ্ধিবাদী দার্শনিকগণ সাধারণত মনে করেন যে, কারণ ও কার্যের মধ্যে একপ্রকার আবশ্যিক বা অনিবার্য সম্পর্ক আছে। অর্থাৎ, কার্য যে কেবল কারণকে অনুগমন করে তা- ই নয়, কারণ হাজির হলে কার্যটিও অবশ্যই হাজির হয়। এরূপ আবশ্যিক মতবাদ অনুযায়ী, কারণ ও কার্যের মধ্যে একপ্রকার অনিবার্য ও আন্তর সম্পর্ক রয়েছে। বুদ্ধিবাদীরা দাবি করেন যে, কারণ হল কার্যের উৎপাদক। সেকারণেই কারণের প্রকৃতি অনুযায়ী কার্যটিও উৎপন্ন হয়। সুতরাং কার্যকারণের মধ্যে একপ্রকার অনিবার্য সম্পর্ক আছে।

ইউয়িংয়ের প্রসক্তি তত্ত্ব: বুদ্ধিবাদী দার্শনিকগণ কার্য ও কারণের মধ্যে যে অনিবার্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন, তারই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা কার্যকারণের সম্বন্ধটিকে প্রসক্তি তত্ত্ব (entailment theory) রূপে উপস্থাপিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইউয়িং (Ewing)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, প্রসক্তি সম্বন্ধ হল এমনই এক সম্বন্ধ, যা অবরোহ অনুমানের ক্ষেত্রে যুক্তিবাক্য তথা হেতুবাক্য এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে দেখা যায়। বৈধ অবরোহ অনুমানের ক্ষেত্রে, যুক্তিবাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়। অর্থাৎ যুক্তিবাক্য এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে একপ্রকার অনিবার্য সম্বন্ধ থাকে। অনুরূপভাবে কার্য ও কারণের মধ্যেও একপ্রকার অনিবার্য বা

আবশ্যিক সম্বন্ধ দেখা যায়। অভ্যন্তরীণ, অবিচ্ছেদ্য ও অবশ্যম্ভাবী সম্বন্ধের ধারণা: বুদ্ধিবাদী
দার্শনিকগণ তাঁদের প্রসক্তি তত্ত্বের মাধ্যমে যে বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চেয়েছেন, তা হল অবরোহ অনুমানে যুক্তিবাক্য তথা হেতুবাক্য এবং সিদ্ধান্তের অন্তঃস্থিত সম্বন্ধটি যেমন অভ্যন্তরীণ, অবিচ্ছেদ্য ও অবশ্যম্ভাবীরূপে গণ্য, তেমনই কার্য ও কারণের সম্বন্ধটিও অভ্যন্তরীণ অবিচ্ছেদ্য ও আবশ্যিকরূপে গ্রাহ্য। কার্য-কারণ সম্পর্কে বুদ্ধিবাদীদের এরূপ মতবাদটিকে তাই অনেক সময় অনিবার্য সম্বন্ধবাদ নামেও উল্লেখ করা হয়। প্রসক্কি তত্ত্বের সমর্থনে ইউয়িংয়ের যুক্তি: প্রসক্তি তত্ত্বের সমর্থনে

অধ্যাপক ইউয়িং দুটি যুক্তির উপস্থাপনা করেছেন- 

i.প্রসক্তি ধরনের অনিবার্যতা: 

অবরোহ অনুমানে আমরা যুক্তিবাক্য তথা হেতুবাক্য থেকে সিদ্ধান্তটিকে যথার্থ ও অনিবার্যভাবে প্রতিষ্ঠা করি। অনুরূপভাবে, কার্যকারণ সম্বন্ধের ক্ষেত্রে আমরা কারণ থেকে কার্যকে যথার্থ ও অনিবার্যভাবে অনুমান করি। অর্থাৎ, কার্যকারণের অন্তঃস্থিত সম্বন্ধ হল যৌক্তিক প্রসক্তি-জাতীয় এক অনিবার্য সম্বন্ধ। এভাবেই আমরা ধোঁয়া এবং আগুনের সম্বন্ধকে তথা কারণ ও কার্যের সম্বন্ধকে প্রসক্তি সম্পর্কের অনিবার্যতারূপে উল্লেখ করি। ইউয়িং-এর এরূপ অভিমতকে সমর্থন করেছেন ব্রড ও ব্লানসার্ড প্রমুখ বুদ্ধিবাদী দার্শনিক।

ii . কারণের ধারণা থেকে কার্যে পৌঁছোনো: দুটি ঘটনার পূর্বাপর

সম্বন্ধ আমরা অভিজ্ঞতায় পাই। কিন্তু অভিজ্ঞতার দ্বারা তাদের মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রসক্তিবাদ অনুযায়ী কার্যের কারণকে যদি হেতুরূপে উল্লেখ করা হয়, তাহলে বিশেষ একটি কারণ থেকে বিশেষ একটি কার্য কেন ঘটে, তার ব্যাখ্যা অবশ্যই পাওয়া যায়। অর্থাৎ, কারণ ও কার্যের মধ্যে হেতুবাক্য বা যুক্তিবাক্য ও সিদ্ধান্তের মতো প্রসক্তি সম্বন্ধ স্বীকৃত হওয়ায়, কারণের ধারণাটি থেকে অনিবার্যভাবে কার্যের ধারণাটিও এসে পড়ে। এভাবেই আমরা বলতে পারি যে আগুন হল দহনের হেতু। অর্থাৎ আগুন ও দহনের মধ্যে প্রসক্তি ধরনের একপ্রকার অনিবার্য সম্বন্ধ আছে।

সমালোচনা: প্রসক্তি তত্ত্বের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ এই যে, প্রসক্তি সম্বন্ধ দেখা যায় শুধু যুক্তিবাক্য এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে। প্রসক্তি সম্বন্ধ কখনোই দুটি বিষয় বা ঘটনার মধ্যে লক্ষ করা যায় না। অথচ দুটি ঘটনার সম্বন্ধকে প্রসক্তি সম্বন্ধের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এর ফলে তুলনীয় বিষয় দুটি সমগোত্রীয় না হওয়ার জন্য কার্যকারণ সম্পর্কিত প্রসক্তি তত্ত্বকে কখনোই সমর্থন করা যায় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ